জুলাই গণহত্যা: কাদেরসহ ৭ জনের মৃত্যুদণ্ড ৫০ শতাংশ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত, ক্ষতিগ্রস্তদের দেওয়ার নির্দেশ

সেখ রাসেল, দপ্তর সম্পদক:
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। মঙ্গলবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এ রায় ঘোষণা করেন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপর আসামিরা হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল এবং নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। সাত আসামিই পলাতক।

রায়ে ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ ও মাইনুল হোসেন খান নিখিলের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির ৫০ শতাংশ বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাজেয়াপ্ত সম্পদের অর্থ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ, আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারীদের পরিবারকে জুলাই ফাউন্ডেশন বা বিধিবদ্ধ কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।

যে মামলায় রায়

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে এ মামলাটি করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ ছিল, আসামিরা আন্দোলন দমনে নির্দেশ, প্ররোচনা ও উসকানি দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ে সহিংসতা পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখেন।

ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে তিনটি ‘কাউন্ট’ বা অভিযোগ আনা হয়েছিল। এর মধ্যে আন্দোলন দমনে ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে ফোনালাপ, দলীয় নেতাকর্মীদের আন্দোলন প্রতিরোধের নির্দেশ এবং ৩ আগস্ট দলীয় কার্যালয়ে নেতাকর্মীদের মাঠে অবস্থানের নির্দেশ দেওয়ার বিষয় ছিল। মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে নির্দেশ, প্ররোচনা ও উসকানির অভিযোগ আনা হয়।

মামলার অভিযোগে ২০২৪ সালের ১১ জুলাই কাদের ও সাদ্দামের ফোনালাপের কথাও উল্লেখ করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই কথোপকথনে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ১৫ জুলাইয়ের বক্তব্য ও বিভিন্ন দলীয় বৈঠকের মাধ্যমে আন্দোলন দমনে নেতাকর্মীদের সক্রিয় করার অভিযোগও আনা হয়।

২৯ সাক্ষী, দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া

মামলাটি প্রথমে ২০২৫ সালে মিস কেস হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়। তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপক্ষ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে। অভিযোগ আমলে নিয়ে ট্রাইব্যুনাল সাত আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। পরে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়।

১৭ ফেব্রুয়ারি শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ। রাষ্ট্রপক্ষ ২৯ জন সাক্ষী উপস্থাপন করে। আগস্টে সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়। ১৪ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণার জন্য ১৫ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করেন।

রাষ্ট্রপক্ষ সাত আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়েছিল। অন্যদিকে রাষ্ট্রনিযুক্ত আসামিপক্ষের আইনজীবীরা অভিযোগ অস্বীকার করে তাঁদের খালাসের আবেদন করেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, আসামিরা কোনো হত্যার নির্দেশ দেননি এবং তাঁদের বিরুদ্ধে কমান্ড রেসপনসিবিলিটির অভিযোগও প্রমাণিত নয়।

রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় বড় রায়

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এর আগে আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। প্রায় ১০ মাস পর দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে এ রায় হলো।

৫ আগস্ট ২০২৪ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হয়। কাদেরসহ সাতজনের মামলার রায়কে সেই বিচারপ্রক্রিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *