৬৬৬ কোটি টাকার কর রায়: ইউনূস-সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডের পুনর্মূল্যায়নের দাবি হাইকোর্টের রায়ের পর সামনে আসছে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের আইনগত বৈধতা ও স্বচ্ছতা যাচাইয়ের প্রশ্ন
সেখ রাসেল, দপ্তর সম্পাদক:
গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দাবি করা ৬৬৬ কোটি ৯১ লাখ ৫২ হাজার ৩৭০ টাকা আয়কর পরিশোধের পথ পরিষ্কার করে হাইকোর্টের দেওয়া সাম্প্রতিক রায় নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পাঁচ করবর্ষের কর নিয়ে গ্রামীণ কল্যাণের করা দুটি রিটের রুল খারিজ করে বৃহস্পতিবার হাইকোর্টের বিচারপতি মুহাম্মদ মুজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের বেঞ্চ এ রায় দেন।
২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ করবর্ষের জন্য এনবিআরের দাবিকৃত মোট করের পরিমাণ ৬৬৬ কোটি ৯১ লাখ ৫২ হাজার ৩৭০ টাকা। কবে নাগাদ এই অর্থ পরিশোধ করতে হবে, তা পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর স্পষ্ট হবে।
এই রায়কে কেন্দ্র করে এখন বড় প্রশ্ন—শুধু একটি কর-সংক্রান্ত মামলার নিষ্পত্তি হিসেবেই কি বিষয়টি দেখা হবে, নাকি সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের আইনগত বৈধতা, স্বচ্ছতা এবং সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাতও নতুন করে পর্যালোচনা করা হবে?
কর মামলার রায়: আইনের প্রয়োগের গুরুত্বপূর্ণ নজির:
গ্রামীণ কল্যাণের কর-সংক্রান্ত বিরোধটি কয়েক বছর ধরে আদালতে ছিল। হাইকোর্টের সাম্প্রতিক রায়ে প্রতিষ্ঠানটির করা দুটি রিটের রুল খারিজ হয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট পাঁচ করবর্ষের জন্য এনবিআরের দাবিকৃত কর আদায়ের ক্ষেত্রে আগের মতো সেই আইনি বাধা থাকল না। তবে এই রায় থেকে সরাসরি ‘কর ফাঁকি প্রমাণিত’—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া আইনগতভাবে সতর্কতার দাবি রাখে। আদালত যে বিষয়ে রায় দিয়েছেন, সেটি হলো এনবিআরের নির্ধারিত করের দাবির বিরুদ্ধে গ্রামীণ কল্যাণের রিটের পরিণতি। ফলে রায়ের আইনগত তাৎপর্যকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তারপরও রায়টি একটি মৌলিক বার্তা সামনে আনে—রাষ্ট্রের রাজস্ব-সংক্রান্ত আইন ও আদালতের সিদ্ধান্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল নয়।
ইউনূসের আমলে গ্রামীণ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের একাধিক অনুমোদন :
ড. মুহাম্মদ ইউনূস ২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর প্রতিষ্ঠিত বা গ্রামীণ-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে সরকারি অনুমোদন ও নীতিগত সিদ্ধান্ত আলোচনায় আসে। ২০২৫ সালের মার্চে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ‘গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি’ প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার জন্য provisional approval দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়টির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান হিসেবে ছিলেন গ্রামীণ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান মো. আশরাফুল হাসান। অনুমোদনটি অবশ্য ২২টি শর্তসাপেক্ষ ছিল এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০-এর বিধান মানার বাধ্যবাধকতা ছিল।
অর্থাৎ অনুমোদন দেওয়ার ঘটনাটি সত্য হলেও, এটিকে নিজেই আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ হিসেবে চিহ্নিত করার আগে অনুমোদন প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট আইনগত শর্তগুলো যাচাই করা প্রয়োজন। একইভাবে গ্রামীণ টেলিকম ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠান সমাধান সার্ভিসেস লিমিটেডও ডিজিটাল পেমেন্ট সেবা দেওয়ার অনুমোদন পায়। প্রতিষ্ঠানটি ২০২১ সালে আবেদন করেছিল এবং ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে NOC পাওয়ার পর ২০২৫ সালের জুনে চূড়ান্ত PSP লাইসেন্স পায়। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো—লাইসেন্সটি ২০২৫ সালে দেওয়া হলেও আবেদনটি করা হয়েছিল ২০২১ সালে। ফলে শুধু অনুমোদনের সময়কাল দেখিয়ে পুরো প্রক্রিয়াকে ‘বিশেষ সুবিধা’ হিসেবে চিহ্নিত করার আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি, যোগ্যতার শর্ত এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
গ্রামীণ ব্যাংকের মালিকানা কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন:
২০২৫ সালে গ্রামীণ ব্যাংকের মালিকানা ও পরিচালনা কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আনে সরকার। সংশোধিত আইনে সরকারের অংশীদারত্ব ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয় এবং ঋণগ্রহীতা-শেয়ারহোল্ডারদের অংশ ৭৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৯০ শতাংশ করা হয়। একই সঙ্গে পরিচালনা কাঠামোতেও পরিবর্তন আনা হয়। এ সিদ্ধান্তটি তখন সরকারের পক্ষ থেকে গ্রামীণ ব্যাংকের মূল দর্শন—ঋণগ্রহীতা-শেয়ারহোল্ডারদের অধিকতর ভূমিকা—বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল। তবে যেহেতু ওই সময় ড. ইউনূস নিজেই সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন, তাই সিদ্ধান্তটির স্বার্থের সংঘাতের সম্ভাবনা, প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁর ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা ছিল কি না—এসব প্রশ্ন ভবিষ্যতে স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা যেতে পারে।
শ্রম ও অর্থসংক্রান্ত মামলায় খালাস: বিতর্কের আরেক অধ্যায়:
ড. ইউনূস ও গ্রামীণ টেলিকমের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শ্রম আইন লঙ্ঘনের মামলা ছিল। ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকার শ্রম আদালত ড. ইউনূসসহ চারজনকে ছয় মাসের কারাদণ্ড ও জরিমানা দিয়েছিলেন। পরে শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনাল সেই দণ্ড বাতিল করে তাঁদের খালাস দেন। এছাড়া গ্রামীণ টেলিকমের শ্রমিক-কর্মচারীদের কল্যাণ তহবিলের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ড. ইউনূসসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা হয়েছিল এবং ২০২৪ সালের জুনে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ওই ১৪ জনের বিরুদ্ধে করা মানি লন্ডারিং মামলাটি প্রত্যাহারের আবেদন আদালত মঞ্জুর করে। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুদকের পক্ষ থেকেই ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৪ ধারায় মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করা হয়েছিল। এই সিদ্ধান্তগুলো আইনসম্মত ছিল কি না, সে বিষয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলা হলে অবশ্যই আদালতের আদেশ, দুদকের আবেদন এবং সংশ্লিষ্ট মামলার নথি পর্যালোচনা করতে হবে। শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের ভিত্তিতে এগুলোকে ‘ক্ষমতার অপব্যবহার’ হিসেবে চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করা যায় না।
সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত: স্বাধীন পর্যালোচনার দাবি :
ইউনূস সরকারের সময় বিভিন্ন সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনগত বিতর্ক হয়েছে। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকার কতটা আইনগত ক্ষমতার মধ্যে থেকে অধ্যাদেশ, আদেশ ও নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে পারে—এ প্রশ্নটি বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামো নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। তবে এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন নিরপেক্ষ সাংবিধানিক পর্যালোচনা। কোন সিদ্ধান্ত সংবিধানবিরোধী, কোনটি প্রশাসনিক ক্ষমতার মধ্যে এবং কোনটির জন্য সংসদীয় অনুমোদন প্রয়োজন—তা নির্ধারণের দায়িত্ব রাজনৈতিক বক্তব্যের নয়, বরং সংবিধান ও আদালতের ব্যাখ্যার ওপর নির্ভরশীল। এ কারণে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে একটি স্বাধীন ও দলনিরপেক্ষ পর্যালোচনা কমিশন গঠনের দাবি উঠতে পারে। কমিশনের কাজ হতে পারে—সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া, সংশ্লিষ্ট নথি, আইনগত ক্ষমতা এবং সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত পরীক্ষা করা।
হামের টিকা ও শিশুমৃত্যুর অভিযোগ: তদন্তের দাবি:
ইউনূস সরকারের সময় স্বাস্থ্যখাতে হামের টিকা সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনা নিয়েও গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। ২০২৬ সালে দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে টিকা সংগ্রহে গাফিলতির অভিযোগ তুলে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের বিরুদ্ধে বিচার ও তদন্তের দাবি ওঠে। প্রথম আলো এ বিষয়ে আইনজীবীদের মানববন্ধনের খবর প্রকাশ করেছে। এ নিয়ে আদালতে মামলার আবেদনও করা হয়েছিল। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি মামলার আবেদনে হামের টিকা না কেনা এবং অবহেলার কারণে শিশুমৃত্যুর অভিযোগ আনা হয়। পরবর্তী সময়ে আরেকটি আবেদন আদালত ‘মামলা গ্রহণ করার উপাদান না থাকার’ কারণ দেখিয়ে খারিজ করে দেয়।
তাই এখানে সরাসরি ড. ইউনূস বা কোনো কর্মকর্তাকে শিশুমৃত্যুর জন্য অপরাধী বলা আইনগতভাবে সঠিক হবে না। বরং টিকা সংগ্রহে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, কোন সময়ে টিকার ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, সরকারি নথিতে কী কারণ দেখানো হয়েছিল এবং সিদ্ধান্তের সঙ্গে মৃত্যুর কোনো প্রত্যক্ষ কারণগত সম্পর্ক আছে কি না—এসব বিষয়ে স্বাধীন তদন্তের দাবি উঠতে পারে। সরকার পরবর্তী সময়ে হামের টিকা সংগ্রহের জন্য ৪১২ কোটি ৭১ লাখ টাকা বরাদ্দ অনুমোদন করে এবং ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনার উদ্যোগ নেয়।
‘সব সিদ্ধান্তের অডিট’—আলোচনায় আসতে পারে নতুন দাবি:
হাইকোর্টের ৬৬৬ কোটি টাকার কর-সংক্রান্ত রায়কে কেন্দ্র করে এখন যে বৃহত্তর প্রশ্নটি সামনে এসেছে তা হলো—ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় কোনো ব্যক্তি বা সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্ত পরবর্তী সময়ে কি স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা উচিত? গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে উত্তরটি হওয়া উচিত—হ্যাঁ, তবে সেই পর্যালোচনা হতে হবে নিরপেক্ষ, প্রমাণনির্ভর এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসামুক্ত।
ড. ইউনূসের আমলে গ্রামীণ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া অনুমোদন, গ্রামীণ ব্যাংকের কাঠামোগত পরিবর্তন, মামলা প্রত্যাহার বা নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং স্বাস্থ্যখাতের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত—প্রতিটি বিষয় আলাদাভাবে নথি ও আইনের আলোকে পরীক্ষা করা যেতে পারে। কোথাও আইন ভঙ্গের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায় নির্ধারণের জন্য যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। আবার কোনো অভিযোগের ভিত্তি না পাওয়া গেলে সেটিও জনগণের সামনে স্পষ্টভাবে জানানো প্রয়োজন।
হাইকোর্টের রায় থেকে যে বার্তা :
গ্রামীণ কল্যাণের কর মামলার রায়কে তাই কেবল ৬৬৬ কোটি টাকার একটি আর্থিক বিরোধের নিষ্পত্তি হিসেবে দেখলে এর বৃহত্তর তাৎপর্য আড়ালে থেকে যেতে পারে। একদিকে এটি রাজস্ব আদায় ও কর আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক সিদ্ধান্ত। অন্যদিকে রায়টি জনপরিসরে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণ কতটা স্বচ্ছ ছিল এবং আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে কি না। তবে এই প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়, প্রয়োজন নথি, তদন্ত, নিরপেক্ষ অডিট এবং বিচারিক পর্যালোচনা। বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে কার্যকর পথও সেটিই—কোনো ব্যক্তি নোবেলজয়ী, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা, রাজনৈতিক নেতা কিংবা প্রভাবশালী ব্যবসায়ী—কোনো পরিচয়ই যেন তদন্তের বাইরে থাকার কারণ না হয়। একইভাবে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেই তাকে অপরাধী ঘোষণা না করে আদালত ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সত্য নির্ধারণ করতে হবে।
৬৬৬ কোটি টাকার কর মামলার রায় সেই নীতিকেই সামনে এনেছে—রাষ্ট্রের রাজস্ব, প্রশাসনিক ক্ষমতা ও বিচার—তিন ক্ষেত্রেই জবাবদিহি সবার জন্য সমান হওয়া উচিত।

