অনলাইন জুয়া–মাদক–ক্যাসিনোর ছোবল, পর্দার আড়ালে ধ্বংস হচ্ছে তারুণ্য, শিক্ষা ও পরিবার; দেশ থেকে চলে যাচ্ছে কোটি কোটি টাকা
সেখ রাসেল, দপ্তর সম্পাদক:
স্মার্টফোনের পর্দায় কয়েকটি ক্লিক। শুরুতে বিনোদন, দ্রুত টাকা আয়ের স্বপ্ন কিংবা বন্ধুদের প্ররোচনা। এরপর ধীরে ধীরে অনলাইন জুয়া, বেটিং ও মাদকের অন্ধকার জগতে ঢুকে পড়ছে দেশের একটি অংশের তরুণ সমাজ। এর প্রভাব শুধু একজন তরুণের জীবনে সীমাবদ্ধ থাকছে না—ভেঙে পড়ছে পরিবার, ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষাজীবন, বাড়ছে ঋণ ও অপরাধপ্রবণতা; একই সঙ্গে অনলাইন জুয়ার অর্থ নানা ডিজিটাল চ্যানেল, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও অবৈধ হুন্ডির মাধ্যমে দেশের বাইরে পাচারের অভিযোগও সামনে আসছে।
সমস্যাটির ভয়াবহতা বোঝা যায় সাম্প্রতিক কয়েকটি সরকারি ও গবেষণাভিত্তিক তথ্য থেকে। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) দেশব্যাপী এক জরিপে আনুমানিক ৮২ লাখ মানুষ অবৈধ মাদক ব্যবহার করেন বলে উঠে এসেছে, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। জরিপে দেখা যায়, ৩৩ শতাংশ ব্যবহারকারী ৮ থেকে ১৭ বছর বয়সে এবং ৫৯ শতাংশ ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সে মাদকের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন।
বাংলাদেশে অনলাইন জুয়ার বিস্তার নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ আছে। সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ অনুযায়ী অনলাইন জুয়ার জন্য পোর্টাল, অ্যাপ বা ডিভাইস তৈরি, পরিচালনা, অংশগ্রহণ, সহায়তা, উৎসাহ দেওয়া কিংবা বিজ্ঞাপনের সঙ্গে যুক্ত থাকা দণ্ডনীয় অপরাধ; এর জন্য সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড বা এক কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
খেলায় বিনোদন, নাকি আসক্তির ফাঁদ? সব অনলাইন গেম জুয়া নয়। কিন্তু অর্থের বিনিময়ে বাজি ধরা, জেতার আশায় বারবার টাকা ঢালা এবং হারানো অর্থ ফেরত পাওয়ার নেশা একটি বিপজ্জনক চক্র তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশি শিশু-কিশোরদের ওপর পরিচালিত একটি জাতীয় পর্যায়ের গবেষণায় ৬–১৭ বছর বয়সী ৫০২ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করে অনলাইন গেমিং আসক্তি ও শিক্ষাগত ফলাফলের মধ্যে নেতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেছে। গবেষণাটিতে দেখা যায়, যারা আসক্ত ছিল না, তাদের শিক্ষাগত পারফরম্যান্স তুলনামূলকভাবে ভালো ছিল।
২০২৬ সালে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম জেলার স্কুলগামী কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে সমস্যাজনক গেমিং আচরণের সঙ্গে পদার্থের ব্যবহার, অভিভাবকের নজরদারির ঘাটতি, দুর্বল parent-child relationship, একাকিত্ব, বুলিং, স্কুল ফাঁকি ও অতিরিক্ত স্ক্রিন-টাইমের সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে। অর্থাৎ বিষয়টি শুধু ‘গেম খেলা’ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবার, শিক্ষা, মানসিক সুস্থতা ও সামাজিক পরিবেশ।
মোবাইলের পর্দা থেকে টাকার অন্ধকার জগৎ: অনলাইন জুয়ার আরেকটি বড় ঝুঁকি অর্থের অবৈধ প্রবাহ। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (BFIU) প্রতিবেদনে অনলাইন গেমের কয়েন কেনার আড়ালে অর্থ পাচারের একটি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশি মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে তা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তরের তথ্য পাওয়া যায় এবং শেষ পর্যন্ত বিদেশি মুদ্রার হিসাবে অর্থ যাওয়ার বিষয়টি শনাক্ত করা হয়েছিল।
BFIU-এর পুরোনো একটি বার্ষিক প্রতিবেদনেও বাংলাদেশি নাগরিকদের বিদেশি রিমোট-গ্যাম্বলিং প্ল্যাটফর্মে অর্থ জমা ও উত্তোলনের তথ্য উঠে এসেছে।
এখানে প্রশ্ন শুধু একজন তরুণ কত টাকা হারালেন—তা নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, ডিজিটাল লেনদেনের বিশাল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে কত অর্থ দেশের বাইরে যাচ্ছে এবং সেই অর্থের উৎস ও গন্তব্য কতটা কার্যকরভাবে শনাক্ত করা হচ্ছে।
মাদকের সঙ্গে যুক্ত হলে বিপদ বহুগুণ : জুয়া ও মাদককে একই বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু সামাজিক বাস্তবতায় আসক্তির বিভিন্ন রূপ একে অন্যকে প্রভাবিত করতে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণাতেও কিশোরদের সমস্যাজনক গেমিং আচরণের সঙ্গে substance use বা পদার্থ ব্যবহারের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশে মাদক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও আইন প্রয়োগের জন্য মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর নিয়মিত বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সংস্থাটির প্রকাশিত পরিসংখ্যানে বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদ্ধার, মামলা ও আসামির তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে।
মাদকাসক্তি একজন ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির পাশাপাশি পরিবারে অর্থনৈতিক চাপ, সহিংসতা, শিক্ষাজীবন থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং অপরাধপ্রবণতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ফলে মাদক নিয়ন্ত্রণকে কেবল অভিযাননির্ভর না রেখে প্রতিরোধ, চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং পরিবারভিত্তিক সচেতনতার সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি।
প্রশাসন কি শুধু অভিযানেই সীমাবদ্ধ? অনলাইন জুয়া বন্ধে অভিযান অবশ্যই প্রয়োজন। খুলনা অঞ্চলেও অনলাইন জুয়া চক্রের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান ও গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া যায়। এক অভিযানে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের কাছ থেকে মোবাইল, ল্যাপটপ ও মাদক উদ্ধারের কথা পুলিশ জানিয়েছে; পাশাপাশি অবৈধ ই-লেনদেনের অভিযোগে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্যও প্রকাশ করা হয়েছে।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে—একটি সাইট বন্ধ করার পর নতুন সাইট, নতুন অ্যাপ, নতুন পেজ কিংবা নতুন লেনদেনের চ্যানেল কত দ্রুত সক্রিয় হচ্ছে?
প্রযুক্তি বদলাচ্ছে দ্রুত। তাই শুধু বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়; প্রয়োজন সাইবার নজরদারি, MFS ও ব্যাংকিং লেনদেনের ঝুঁকি বিশ্লেষণ, অবৈধ বিজ্ঞাপন বন্ধ, অর্থের উৎস শনাক্তকরণ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং দ্রুত আইনি ব্যবস্থা।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষা ও পরিবার : একজন শিক্ষার্থী যখন রাতের পর রাত জুয়া বা গেমিংয়ে ব্যস্ত থাকে, তখন ক্ষতিটা শুধু তার পরীক্ষার ফলাফলে সীমাবদ্ধ থাকে না। ঘুমের ব্যাঘাত, পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাওয়া, সামাজিক সম্পর্ক থেকে দূরে সরে যাওয়া এবং পরিবারের সঙ্গে বিরোধ—সবই ধীরে ধীরে তৈরি হতে পারে।
আর জুয়ার ক্ষেত্রে হারানো টাকা ফেরত পাওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা অনেক সময় একজন ব্যবহারকারীকে আরও বেশি অর্থ ঝুঁকিতে ফেলতে বাধ্য করে। সেখান থেকেই শুরু হতে পারে ঋণ, প্রতারণা, পারিবারিক সম্পদ বিক্রি কিংবা অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি।
এখনই দরকার সমন্বিত প্রতিরোধ : বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে কয়েকটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে—
প্রথমত, অনলাইন জুয়া ও বেটিংয়ের বিজ্ঞাপন, প্রচারক এবং অর্থ লেনদেনের চ্যানেল শনাক্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা। দ্বিতীয়ত, ব্যাংক ও MFS প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে BFIU-কে তথ্য সরবরাহ আরও কার্যকর করা। তৃতীয়ত, স্কুল-কলেজে ডিজিটাল আসক্তি, অনলাইন জুয়া ও মাদকের ক্ষতি নিয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মসূচি। চতুর্থত, অভিভাবকদের জন্য ডিজিটাল প্যারেন্টিং ও সন্তানের অনলাইন আচরণ পর্যবেক্ষণের প্রশিক্ষণ। পঞ্চমত, আসক্ত ব্যক্তিকে শুধু অপরাধী হিসেবে না দেখে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করা। ষষ্ঠত, সাংবাদিক, শিক্ষক, অভিভাবক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি খাতের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ গড়ে তোলা।
তারুণ্য বাঁচাতে এখনই সিদ্ধান্তের সময় : বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ জনগোষ্ঠী। সেই তরুণদের একটি অংশ যদি মাদকের নেশা, অনলাইন জুয়ার প্রলোভন কিংবা সমস্যাজনক গেমিংয়ের ফাঁদে আটকে যায়, তার প্রভাব ব্যক্তি ছাড়িয়ে পরিবার, শিক্ষা, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় উৎপাদনশীলতার ওপর পড়ে। তাই এটি শুধু ‘জুয়া বন্ধের’ অভিযান নয়; এটি একটি প্রজন্মকে রক্ষার লড়াই।
আইন প্রয়োগ করতে হবে—কিন্তু তার পাশাপাশি দরকার প্রতিরোধ। সাইট বন্ধ করতে হবে—কিন্তু তার সঙ্গে অর্থের পথও বন্ধ করতে হবে। মাদক উদ্ধার করতে হবে—কিন্তু একই সঙ্গে আসক্ত ব্যক্তিকে ফিরিয়ে আনতে হবে স্বাভাবিক জীবনে।
আজ যে মোবাইল ফোনটি একজন তরুণের হাতে ভবিষ্যৎ গড়ার হাতিয়ার, সেটিই যেন তার সর্বনাশের দরজা না হয়ে ওঠে—এ দায়িত্ব শুধু প্রশাসনের নয়; পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি খাত, গণমাধ্যম ও পুরো সমাজের। প্রশ্ন একটাই—আমরা কি তরুণদের হাতে শুধু প্রযুক্তি তুলে দেব, নাকি প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহারও শেখাব?

