কিংবদন্তি অভিনেতা ও চাঁদপুরের কৃতি সন্তান সাদেক বাচ্চু
মোঃ জাবেদ হোসেনঃ বাংলাদেশের চলচ্চিত্র, টেলিভিশন ও মঞ্চনাটকের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নাম সাদেক বাচ্চু। তাঁর প্রকৃত নাম মাহবুব আহমেদ সাদেক। প্রায় পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে অভিনয়জীবনে তিনি খল-অভিনেতা হিসেবে দর্শকদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। অসাধারণ অভিনয় দক্ষতা, সংলাপ উপস্থাপন এবং চরিত্রে প্রাণ সঞ্চারের মাধ্যমে তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম কিংবদন্তি শিল্পীতে পরিণত হন।
১৯৫৫ সালের ১ জানুয়ারি চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জে তাঁর পৈত্রিক নিবাসে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈত্রিক বাড়ি চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জ উপজেলার ১০নং গন্ধর্ব্যপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের পশ্চিম দেশগাঁও আতাউদ্দিন সর্দার বাড়িতে। তবে তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকায়।
তাঁর পিতা মরহুম নূর মোহাম্মদ বাংলাদেশ ডাক বিভাগের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। গণমাধ্যমে তাঁর মায়ের নাম উল্লেখ না থাকলেও জানা যায়, তিনি ছিলেন একজন গৃহিণী। মাত্র ১৫ বছর বয়সে পিতাকে হারানোর পর বিধবা মা ও বৃহৎ পরিবারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন সাদেক বাচ্চু।
পারিবারিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি ৪০ বছর বয়সের পর বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর স্ত্রীর নাম শাহনাজ জাহান (শাহনাজ বাচ্চু)। তাঁদের সংসারে দুই কন্যা—মেহজাবীন ও নওশিন এবং এক পুত্র—সোয়ালেহিন রয়েছে।
অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ ডাক বিভাগের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০১৩ সালে অবসর গ্রহণ করেন।
সাদেক বাচ্চুর অভিনয়জীবনের সূচনা হয় ১৯৬৩ সালে মঞ্চ ও বেতারের মাধ্যমে। তিনি ‘মতিঝিল থিয়েটার’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি ছিলেন। পরে বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় নাটক প্রথম অঙ্গীকার-এর মাধ্যমে ছোট পর্দায় আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৮৫ সালে শহীদুল আমিন পরিচালিত রামের সুমতি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে বড় পর্দায় যাত্রা শুরু করেন। ১৯৯১ সালে এহতেশাম পরিচালিত চাঁদনী চলচ্চিত্রে খল চরিত্রে অভিনয় করে তিনি দেশব্যাপী ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে কোটি টাকার কাবিন, পিতা মাতার আমানত, সুজন সখী, আমার প্রাণের স্বামী এবং মন বসে না পড়ার টেবিলে। জীবনের শেষ পর্যায়েও তিনি অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকদের মুগ্ধ করে গেছেন।
অভিনয়ে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৮ সালে একটি সিনেমার গল্প চলচ্চিত্রে শ্রেষ্ঠ খল-অভিনেতা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন।
২০২০ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রাঙ্গন এক গুণী অভিনেতাকে হারায়। আজও সাদেক বাচ্চু তাঁর অসংখ্য কালজয়ী চরিত্র ও অভিনয়কর্মের মাধ্যমে দর্শকের হৃদয়ে অমর হয়ে আছেন। চাঁদপুরের এই কৃতি সন্তানের অবদান বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

