অবকাঠামোর উন্নয়ন বনাম নৈতিকতার সংকট: হরিপুরের গণমাধ্যম কি পারবে দর্পণের ভূমিকা রাখতে? মুদ্রার অপর পিঠটি বড়ই অন্ধকার !
জসীমউদ্দিন ইতি ঠাকুরগাঁও।
একটি অঞ্চলের উন্নয়ন, জনমানুষের অধিকার রক্ষা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রধান দর্পণ হলো স্থানীয় গণমাধ্যম। ঠাকুরগাঁওয়ের সীমান্তবর্তী উপজেলা হরিপুরের ক্ষেত্রে এই কথাটি আরও বেশি সত্য। সম্প্রতি হরিপুর প্রেসক্লাবের নবগঠিত কমিটিতে সভাপতি হিসেবে মোঃ আল মামুন চৌধুরী এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মোঃ আব্দুর রশিদ দায়িত্ব গ্রহণ করায় আমরা তাঁদের জানাই আন্তরিক অভিনন্দন। নতুন এই নেতৃত্বকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি হরিপুরের সাংবাদিকতার বর্তমান সংকট, সম্ভাবনা এবং কিছু নির্মম সত্যকে আজ সম্পাদকীয়র কাঠগড়ায় দাঁড় করানো জরুরি হয়ে পড়েছে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে জানা গেছে, হরিপুরের দুটি প্রেসক্লাবের জন্য সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় এই উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাই। মফস্বল সাংবাদিকতার চিত্রটি অত্যন্ত জরাজীর্ণ; সিংহভাগ গণমাধ্যমকর্মী তাঁদের মূল প্রতিষ্ঠান থেকে ন্যূনতম কোনো আর্থিক সুবিধা বা বেতন-ভাতা পান না। এমন পরিস্থিতিতে একটি প্রেসক্লাবের নিজস্ব মজবুত অবকাঠামো, বসার সুপরিবেশ এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে এই বরাদ্দ অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। একটি সুশৃঙ্খল ও শক্তিশালী প্রেসক্লাব তখনই গড়ে উঠবে, যখন সেখানে কোনো বিভেদ থাকবে না এবং সর্বস্তরের সৎ ও নির্ভীক সংবাদকর্মীরা একসাথে বসে কাজ করার সুযোগ পাবেন।
কিন্তু মুদ্রার অপর পিঠটি বড়ই অন্ধকার ও বেদনাদায়ক। হরিপুরে দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন আর বরাদ্দের নামে যে লুটপাটের সংস্কৃতি চলছে, তা কারো অজানা নয়। সবচেয়ে বড় দুঃখের বিষয় হলো, যদি সমাজের দর্পণ বা গণমাধ্যমকর্মীরাই সেই লুটপাটের প্রধান হাতিয়ার কিংবা মদদদাতা হিসেবে কাজ করেন, তবে তা একটি অঞ্চলের জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনে। সাংবাদিকতার আড়ালে যখন কোনো কোনো মহলের দালালি, লেজুড়বৃত্তি কিংবা সিন্ডিকেটবাজি আশ্রয় পায়, তখন সাধারণ মানুষের আর যাওয়ার কোনো জায়গা থাকে না। গণমাধ্যম যদি নিজেই অনিয়ম ও দুর্নীতির সহযোগী হয়ে ওঠে, তবে হরিপুর চিরকাল জরাজীর্ণ ও অবহেলিতই থেকে যাবে। আমরা হরিপুরকে আর সেই অন্ধকারে দেখতে চাই না।
নতুন এই কমিটিকে মনে রাখতে হবে, সাংবাদিকতাকে মর্যাদাপূর্ণ করতে হলে ক্লাবের ভেতরে এবং নেতৃত্বে অবশ্যই সুশৃঙ্খল, মার্জিত, ভদ্র ও নীতিবান ব্যক্তিদের প্রাধান্য দিতে হবে। কিছু আংশিক পকেট কমিটি গঠন করে কিংবা দপ্তরে দপ্তরে ফাইল চালাচালি করে বরাদ্দ ভাগাভাগির পুরোনো নোংরা খেলা বন্ধ করার সময় এসেছে। ক্লাবে কী বরাদ্দ আসছে, তা কীভাবে ব্যয় হচ্ছে—সবকিছু সাধারণ মানুষ এবং সকল গণমাধ্যমকর্মীর সামনে সম্পূর্ণ প্রকাশ্যে ও স্বচ্ছতার সাথে তুলে ধরতে হবে। গোপনীয়তার সংস্কৃতি ভেঙে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই হবে নতুন নেতৃত্বের প্রথম সফল পরীক্ষা।
হরিপুরের টেকসই উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন সৎ, সাহসী ও নির্ভীক গণমাধ্যমকর্মীরা ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে একতাবদ্ধ হবেন। সাংবাদিকদের কাজ কোনো দুর্নীতিবাজের চামচামি করা বা লুটপাটের অংশীদার হওয়া নয়; বরং লুটপাটের বিরুদ্ধে ঢাল হয়ে দাঁড়ানো। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে চাই, মোঃ আল মামুন চৌধুরী এবং মোঃ আব্দুর রশিদ-এর নেতৃত্বাধীন এই নতুন কমিটি অতীতের সমস্ত জরাজীর্ণতা, দুর্নাম ও অপসাংবাদিকতার বৃত্ত ভেঙে একটি আদর্শ পরিবেশ তৈরি করবে। হরিপুরের গণমাধ্যমকর্মীরা আর কারও লুটপাটের হাতিয়ার হবে না, বরং তারা হবে শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ের অতন্দ্র প্রহরী এবং হরিপুর উন্নয়নের সার্বিক সহযোগী।
নবনির্বাচিত কমিটির সকল কর্মকর্তার সফল কার্যকাল ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করছি। অবসান হোক অপসাংবাদিকতার, জয় হোক সত্য ও বস্তুনিষ্ঠতার।

