প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে অনুপ্রেরণার স্মারক ‘প্রাথমিক শিক্ষা পদক’
জসীমউদ্দিন ইতি: একটি দেশের সার্বিক উন্নয়নের মূল ভিত্তি হলো টেকসই ও মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা। শিশুদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ, নৈতিক মূল্যবোধের অবয়ব তৈরি এবং ভবিষ্যৎ সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার গুরুদায়িত্ব অর্পিত থাকে মাঠপর্যায়ের প্রাথমিক বিদ্যালয়, শিক্ষক এবং শিক্ষা প্রশাসনের ওপর। সম্প্রতি ঠাকুরগাঁও জেলায় ‘জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক ২০২৬’-এর জেলা পর্যায়ের যে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, তা কেবল কিছু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি নয়, বরং তা জেলার সামগ্রিক প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার এক ইতিবাচক উদ্দীপনার প্রতিফলন।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা পদক কমিটির সভাপতি ও ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রফিকুল হক এবং সদস্য সচিব ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো: মোফাজ্জল হোসেনের যৌথ স্বাক্ষরে প্রকাশিত এই তালিকায় জেলার বিভিন্ন প্রান্তের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক-শিক্ষিকা, কর্মকর্তা, কর্মচারী, কাব শিক্ষক ও শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে মূল্যায়ন করা হয়েছে। অত্যন্ত স্বচ্ছ ও নিবিড় যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে এই নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে, যা মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা ও শিক্ষকদের মাঝে কাজের সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি করতে অনন্য ভূমিকা রাখবে।
এবারের ফলাফলের দিকে তাকালে দেখা যায়, জেলা সদর থেকে শুরু করে হরিপুর, পীরগঞ্জ কিংবা রানীশংকৈলের মতো সীমান্তবর্তী ও প্রত্যಂತ উপজেলার প্রতিনিধিরা নিজ নিজ কর্মদক্ষতার স্বাক্ষর রেখে তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন। শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক, সহকারী শিক্ষক কিংবা কাব শিক্ষকদের এই স্বীকৃতি প্রমাণ করে যে, সুযোগ ও সঠিক মূল্যায়ন পেলে প্রান্তিক জনপদের শিক্ষকেরাও জাতীয় মানদণ্ডে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে পারেন। বিশেষ করে শ্রেষ্ঠ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসেবে হরিপুরের ‘ডাঙ্গীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ এবং শ্রেষ্ঠ ইউএনও হিসেবে সদর উপজেলার মো: খাইরুল ইসলামের নির্বাচিত হওয়া—প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের এক চমৎকার দৃষ্টান্ত।
আমাদের দেশের প্রাথমিক শিক্ষা খাত নানাবিধ চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। শতভাগ শিশু ভর্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হলেও, ঝরে পড়া রোধ করা, শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ আনন্দময় করা এবং যুগোপযোগী ও গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করা এখনো এক বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ জয়ে সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হলেন শিক্ষকেরা। একজন শিক্ষকের নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা একটি ঝিমিয়ে পড়া বিদ্যালয়কে প্রাণবন্ত করে তুলতে পারে। আর সেই নিষ্ঠার যখন রাষ্ট্রীয় বা জেলা পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়ন ঘটে, তখন তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কর্মস্পৃহা হাজার গুণ বাড়িয়ে দেয়। এই স্বীকৃতি দেখে অন্য শিক্ষকেরাও নিজেদের বিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীদের প্রতি আরও বেশি যত্নশীল হতে অনুপ্রাণিত হবেন—এটাই এই পদকের মূল সার্থকতা।
জেলা পর্যায়ে যারা শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরেছেন, তাদের সামনে এখন আরও বড় পরীক্ষা। তারা আগামীতে রংপুর বিভাগীয় পর্যায় এবং পরবর্তীতে জাতীয় পর্যায়ে ঠাকুরগাঁও জেলার প্রতিনিধিত্ব করবেন। আমরা আশা করি, জেলা পর্যায়ের এই সেরার দল আগামীতেও তাদের মেধা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে পুরো দেশের বুকে ঠাকুরগাঁওয়ের নাম উজ্জ্বল করবেন।
পরিশেষে, জেলা শিক্ষা পদক কমিটিকে একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তালিকা উপহার দেওয়ার জন্য সাধুবাদ জানাই। এই স্বীকৃতির ধারা যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মাঠপর্যায়ের প্রতিটি বিদ্যালয়ে শিক্ষাদানের মান বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা। নির্বাচিত সকল শিক্ষক, কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি রইল আন্তরিক অভিনন্দন ও নিরন্তর শুভকামনা।

