বটিয়াঘাটা এইচ কে বিশেষ শিক্ষা প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় পরিদর্শনে ইউএনও, ম্যানেজিং কমিটি-২০২৬ এর প্রথম সভা অনুষ্ঠিত
সেখ রাসেল, বিভাগীয় ব্যুরো চিফ, খুলনা।
খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার এইচ কে বিশেষ শিক্ষা প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় পরিদর্শন করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) থান্দার কামরুজ্জামান। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টার দিকে তিনি বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেন। এ সময় বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় বিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রম, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা, যাতায়াত ব্যবস্থা, অবকাঠামোগত সংকট এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা ও মতবিনিময় হয়।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দিপা বৈরাগীর সভাপতিত্বে সভায় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা নিগার সুলতানা, প্রকৌশলী গৌতম কুমার মন্ডল এবং বটিয়াঘাটা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মোঃ সোহরাব হোসেন মুন্সী।
সভায় সবচেয়ে গুরুত্ব পায় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের বিদ্যালয়ে যাতায়াতের বিষয়টি। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো পরিবহন ব্যবস্থা না থাকায় অনেক শিশুর নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া বিদ্যালয়ের জন্য নতুন ভবন নির্মাণ, সুপেয় পানির ব্যবস্থা, সাবমার্সিবল পাম্প স্থাপন, পাকা টয়লেট নির্মাণসহ শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়েও আলোচনা হয়।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালে বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিজেদের অর্থায়নে ০.২২৫০ একর জমি ক্রয় করে তা প্রতিষ্ঠানের নামে দান করেন। এরপর থেকে দীর্ঘ ১১ বছর ধরে শিক্ষক-কর্মচারীদের নিজস্ব অর্থায়ন ও প্রচেষ্টায় বিদ্যালয়টির কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। বর্তমানে বিভিন্ন বয়সের ১২১ জন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থী এখানে পড়াশোনা করছে।
বিদ্যালয়টির অতীত কার্যক্রমের স্মৃতি তুলে ধরে সংশ্লিষ্টরা জানান, সাবেক ইউএনও আহম্মেদ জিয়াউর রহমানের সময় বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য তিনটি ইঞ্জিনচালিত ছাউনিবেষ্টিত ভ্যান ছিল। মোবাইলে সংরক্ষিত ওই সময়ের বিভিন্ন ছবি পূর্বেও বর্তমান ইউএনও মহোদয়কে দেখিয়েছে বলে জানান অত্র বিদ্যালয়ের জুনিয়র শিক্ষাক সেখ মোঃ রাসেল হোসেন। বর্তমানে পরিবহন সুবিধা না থাকায় শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে।
শিক্ষক-কর্মচারীদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের অর্থ ও শ্রম দিয়ে বিদ্যালয়টি পরিচালনা করা হলেও বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি পর্যায় থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না এলে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। এতে শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমই নয়, ১২১ জন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীর শিক্ষা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তাঁরা বলেন, ২০১৫ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত নিজেদের অর্থায়নে পরিচালিত এই বিদ্যালয়টি এখন আর্থিক ও অবকাঠামোগত সংকটের মুখে পড়েছে। প্রয়োজনীয় সহায়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি না পেলে দীর্ঘদিনের আশা-স্বপ্ন নিয়ে গড়ে তোলা বিদ্যালয়টির শিক্ষক-কর্মচারীদের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
পরিদর্শনকালে ইউএনও থান্দার কামরুজ্জামান বিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের শিক্ষার পরিবেশ আরও উন্নত করা এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়ে তিনি মতামত দেন।
বিদ্যালয়টির নিবন্ধন ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির বিষয়টিও সভায় গুরুত্ব পায়। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বিদ্যালয়ের নিজস্ব জমি, প্রতিষ্ঠাকাল থেকে কার্যক্রম পরিচালনা, শিক্ষার্থী সংখ্যা, শিক্ষক-কর্মচারীদের তালিকা, ম্যানেজিং কমিটি, অবকাঠামো, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও পাঠদানের ধারাবাহিকতার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও উপস্থাপন করা হলে বিদ্যালয়টির নিবন্ধন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া সহজ হবে।
এ ক্ষেত্রে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জমির দলিল ও প্রতিষ্ঠানের নামে দানের কাগজপত্র, ম্যানেজিং কমিটির অনুমোদিত তালিকা, শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়োগ ও যোগ্যতার কাগজপত্র, শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা, উপস্থিতির রেজিস্টার, পাঠদানের তথ্য, আয়-ব্যয়ের হিসাব, বিদ্যালয়ের ভবন ও জমির তথ্য, প্রতিষ্ঠার ইতিহাস এবং স্থানীয় প্রশাসনের প্রত্যয়ন যথাযথভাবে প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। তবে নিবন্ধনের জন্য চূড়ান্ত কী কী শর্ত পূরণ করতে হবে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ বিধিমালা অনুযায়ী যাচাই করা জরুরি।
সভায় ম্যানেজিং কমিটির শিক্ষক প্রতিনিধি সেখ মোঃ রাসেল হোসেন, শিক্ষক প্রতিনিধি দেব দুলাল জোয়াদ্দার, শিক্ষানুরাগী, উদ্যোক্তা গৌরহরি বৈরাগী, অভিভাবক প্রতিনিধি নবনীতা মন্ডলসহ বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়াও শিক্ষক অম্লান রায়, নিপা রানী বালা, সেতু গাইন, শিরীনা নাজনীন, কপিল বিশ্বাস, বৈশাখী বাছাড়, ডালিয়া মন্ডল, সীমা রানী মন্ডল, পিয়ালী রায়, ইভা ঢালী, অম্বিকা রায় ও মুক্তা সরকার এবং কর্মচারী সুমন কুমার কর্মকার, জীবন জোয়াদ্দার, সুনীতা ঢালী, নিতাই সরকার, উত্তম মন্ডল ও বিবেক মন্ডল উপস্থিত ছিলেন।
সভায় স্থানীয় সাংবাদিকবৃন্দের মধ্যে মোঃ ইমরান হোসেন ও এলাকাবাসীও উপস্থিত ছিলেন।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, প্রশাসনের নজরদারি ও সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা পেলে বিদ্যালয়টি শুধু টিকে থাকবে না, বরং ১২১ জন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর শিক্ষা, দক্ষতা ও স্বাভাবিক জীবন গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল হিসেবে গড়ে উঠবে।

