বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনে প্রজনন মৌসুমেও বিষ দিয়ে মাছ শিকার, বন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সহযোগিতার অভিযোগ

এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সুন্দরবন থেকে ফিরে:দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্বখ্যাত ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ও মৎস্যভান্ডার বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনে মাছের প্রজনন মৌসুমেও থেমে নেই বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার। পূর্ব ও পশ্চিম সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী-খালে নিষিদ্ধ উপায়ে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার অভিযোগ উঠেছে। এতে ধ্বংস হচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, মাছের পোনা ও অন্যান্য জলজ প্রাণী। একই সঙ্গে বিষমিশ্রিত পানি ও মাছের কারণে বন্যপ্রাণী ও মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে।

অভিযোগ রয়েছে, জেলে নামধারী এক শ্রেণির দুর্বৃত্তের অবৈধ কর্মকাণ্ডে বন বিভাগের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে সহযোগিতা করছেন। ফলে প্রজনন মৌসুমে সুন্দরবনে মাছ ধরার পাশ-পারমিট বন্ধ থাকার বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রে কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

তিন মাস মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা, তবুও চলছে বিষ প্রয়োগ

সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবনের প্রায় ৩১ শতাংশ এলাকাজুড়ে জলাভূমি রয়েছে। জালের মতো ছড়িয়ে থাকা প্রায় ৪৫০টি নদী-খালে রয়েছে বিপুল মৎস্যসম্পদ। এসব জলাশয়ে প্রায় ২১০ প্রজাতির সাদা মাছ, ২৬ প্রজাতির চিংড়ি ও ১৩ প্রজাতির কাঁকড়াসহ অসংখ্য জলজ প্রাণীর বসবাস।

বর্তমানে সুন্দরবনে মাছের প্রধান প্রজনন মৌসুম। এ কারণে জুন, জুলাই ও আগস্ট—এই তিন মাস সুন্দরবনে মাছ শিকার এবং জেলেদের পাশ-পারমিট বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, নিষেধাজ্ঞার সুযোগে কিছু অসাধু জেলে কম পরিশ্রমে বেশি লাভের আশায় অবৈধভাবে বনে প্রবেশ করে বিভিন্ন নদী ও খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার করছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, এমনকি মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত নিষিদ্ধ খালেও বিষ প্রয়োগ করা হচ্ছে। এতে মাছের প্রজনন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সুন্দরবনের সামগ্রিক জলজ পরিবেশ হুমকির মুখে পড়ছে।

যেভাবে বিষ দিয়ে মাছ শিকার

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, মধ্যভাটার সময় খালের গোড়ায় জাল পেতে খালের আগায় বিষ প্রয়োগ করা হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিষের প্রভাবে মাছ ছটফট করতে করতে দুর্বল হয়ে পানিতে ভেসে জালে এসে আটকা পড়ে।

অভিযোগ রয়েছে, এ কাজে ভারতীয় অবৈধ রিপকট, ক্যারাটে, হিলডন, ওস্তাদ ও বিষ পাউডারসহ বিভিন্ন ধরনের বিষ ব্যবহার করা হচ্ছে।

এভাবে বিষ প্রয়োগের ফলে শুধু বড় মাছই নয়, মাছের পোনা ও অন্যান্য জলজ প্রাণীও মারা যাচ্ছে। বিষমিশ্রিত পানি পান করে বাঘ, হরিণসহ সুন্দরবনের অন্যান্য বন্যপ্রাণীও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে বিষাক্ত মাছ মানুষের খাদ্যচক্রে প্রবেশ করলে পেটের পীড়াসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

বন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে উৎকোচ নেওয়ার অভিযোগ

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক জেলে অভিযোগ করেন, অমাবস্যা ও পূর্ণিমার গোনে নৌকাপ্রতি উৎকোচ নিয়ে বন বিভাগের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী অবৈধভাবে মাছ শিকারে সহযোগিতা করেন।

তাদের অভিযোগ, ডুবোজালপ্রতি ৫ হাজার টাকা, আটনজালপ্রতি ৩ হাজার টাকা এবং দোনদড়িপ্রতি ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। টাকা না দিলে অবৈধভাবে বনে প্রবেশের অভিযোগে বিভিন্ন ধারায় মামলা দিয়ে আদালতে পাঠানোর ভয় দেখানো হয় বলেও অভিযোগ করেছেন তারা।

তবে এসব অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

মৎস্য সম্পদ রক্ষায় কঠোর ব্যবস্থা চান সংশ্লিষ্টরা

ফিশ ফার্ম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (ফোয়াব) ও খুলনা কেন্দ্রীয় মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি মোল্লা সামছুর রহমান শাহিন বলেন, প্রজনন মৌসুমে সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া ধরা পুরোপুরি বন্ধ করা জরুরি। এভাবে চলতে থাকলে সম্ভাবনাময় প্রাকৃতিক মৎস্যসম্পদ একসময় বিলুপ্তির মুখে পড়তে পারে।

তিনি বলেন, সুন্দরবন ও এর জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বন বিভাগকে আরও কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। নদী, খাল ও নিষিদ্ধ এলাকায় বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার বন্ধের পাশাপাশি বন্যপ্রাণী শিকারও বন্ধ করতে হবে। অপরাধে জড়িত জেলেদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তাদের বিকল্প কর্মসংস্থান বা ভাতার আওতায় আনারও দাবি জানান তিনি।

একই সঙ্গে অবৈধ মাছ শিকারে কোনো বন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

বিষমিশ্রিত মাছ ও পানিতে স্বাস্থ্যঝুঁকি

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সুদীপ বালা জানান, বিষমিশ্রিত মাছ খেলে মানুষের কিডনি ও লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একইভাবে বিষমিশ্রিত পানি পান করলে বিভিন্ন প্রাণীরও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা আবুবকর সিদ্দিক বলেন, সুন্দরবনে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরা অত্যন্ত ক্ষতিকর ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড। এতে মাছের পাশাপাশি পোনা ও অন্যান্য জলজ প্রাণীও ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ে।

তিনি বলেন, সুন্দরবনের অভ্যন্তরে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের নজরদারি ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব বন বিভাগের। মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জেলেদের সচেতন করা হচ্ছে এবং বিষমুক্ত ও টেকসই পদ্ধতিতে মাছ আহরণে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

১৫ নৌকা ও ১৪২ কেজি বিষমিশ্রিত মাছ জব্দ

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) দ্বীপন চন্দ্র দাস জানান, প্রজনন মৌসুমে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার ও অবৈধ অনুপ্রবেশের ঘটনায় বেশ কয়েকটি মামলা হয়েছে।

তিনি জানান, অভিযানে ৩০টি ছোট বোতল ও দুটি বড় বোতল বিষ, ১৫টি নৌকা, ১০টি জাল এবং বিষমিশ্রিত প্রায় ১৪২ কেজি মাছ জব্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি দুই বস্তা শুঁটকি মাছও জব্দ করা হয়। পরে জব্দ করা মাছ নিলামের মাধ্যমে প্রতি কেজি ৬৮৫ টাকা দরে বিক্রি করা হয়েছে।

জেলেদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ২০টি ভারানি খালের মুখ ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি সার্বক্ষণিক ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি চালানো হচ্ছে।

এসিএফ দ্বীপন চন্দ্র দাস বলেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার সুন্দরবনে অবৈধ অনুপ্রবেশ অনেক কম। তবে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রজনন মৌসুমে নজরদারি আরও জোরদারের দাবি

সুন্দরবনের নদী-খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার শুধু তাৎক্ষণিকভাবে মৎস্যসম্পদ ধ্বংস করছে না, এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে পুরো জলজ প্রতিবেশব্যবস্থায়। বিশেষ করে প্রজনন মৌসুমে মা মাছ ও পোনা ধ্বংস হলে ভবিষ্যতে মাছের স্বাভাবিক উৎপাদন ও প্রাপ্যতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সুন্দরবনের মৎস্যসম্পদ রক্ষায় নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের পাশাপাশি অবৈধ বিষের উৎস বন্ধ, নদী-খালে নিয়মিত টহল, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং বন বিভাগের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রকৃত জেলেদের বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করা গেলে অবৈধভাবে বনে প্রবেশ ও বিষ দিয়ে মাছ শিকারের প্রবণতা কমানো সম্ভব হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *