ছোট বোনকে লিভার দান করে নতুন জীবন দিলেন বড় বোন

এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির,সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার: বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ও মৎস্যভান্ডার হিসেবে খ্যাত বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন-সংলগ্ন বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলায় ঘটেছে ভালোবাসা ও আত্মত্যাগের এক বিরল দৃষ্টান্ত। রক্তের বন্ধনের কাছে হার মেনেছে মরণব্যাধি লিভার সিরোসিস। মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করা ছোট বোনকে নিজের লিভারের একাংশ দান করে নতুন জীবন উপহার দিয়েছেন বড় বোন।

শনিবার (৪ জুলাই) বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) দীর্ঘ ও জটিল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সফলভাবে লিভার প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হয়। এ মানবিক ও সাহসী উদ্যোগের নায়ক দুই বোন—বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার আয়েশা সিদ্দিকা আঁখি ও ইসমত আরা ইতি।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, শরণখোলা উপজেলার ২ নম্বর খোন্তাকাটা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আলমগীর তালুকদারের ছোট মেয়ে ইসমত আরা ইতি দীর্ঘদিন ধরে লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত ছিলেন। তিনি শরণখোলা সরকারি ডিগ্রি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী। শারীরিক অবস্থার ক্রমাবনতির একপর্যায়ে চিকিৎসকরা তাকে বাঁচাতে লিভার প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দেন।

এ সময় বড় বোন আয়েশা সিদ্দিকা আঁখি বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে নিজের লিভারের একটি অংশ দান করার সিদ্ধান্ত নেন। নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের শিক্ষার্থী আঁখি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েই ছোট বোনের জীবন বাঁচাতে এগিয়ে আসেন।

গত পাঁচ মাস ধরে চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অর্থ সংগ্রহ এবং রক্তের ব্যবস্থা করতে পরিবারটিকে কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। অস্ত্রোপচারের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক আবেগঘন স্ট্যাটাসে আঁখি লিখেছিলেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি বোনদের বলতেন—তাদের ভাই না থাকলেও তিনিই ভাইয়ের দায়িত্ব পালন করবেন। ভাই যেমন বোনের জন্য সবকিছু করতে পারে, তিনিও আজীবন সেই দায়িত্ব পালন করবেন।

লিভার দান প্রসঙ্গে তিনি লিখেন, “আমার ছোট বোন সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে—এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। এটি কোনো ত্যাগ নয়, এটি আমার দায়িত্ব, ভালোবাসা ও কর্তব্য।”

লিভার প্রতিস্থাপনের মতো ব্যয়বহুল চিকিৎসা একটি সাধারণ পরিবারের জন্য ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। তবে ইতির চিকিৎসায় স্থানীয় সর্বস্তরের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসেন। সংবাদকর্মী, কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অসংখ্য ব্যবহারকারী প্রচারণা চালিয়ে অর্থ সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দেশ-বিদেশের অনেক হৃদয়বান মানুষের আর্থিক সহায়তা এবং স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতাদের সহযোগিতায় অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।

চূড়ান্ত অস্ত্রোপচারের আগে পিতা আলমগীর তালুকদার দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়ে বলেছিলেন, এক মেয়ের আত্মত্যাগ যেন আরেক মেয়ের জীবনের আলো হয়ে ওঠে। তার সেই প্রার্থনা বাস্তবে রূপ নিয়েছে।

সফল অস্ত্রোপচারের পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুই বোনই বর্তমানে চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন এবং তাদের শারীরিক অবস্থা সন্তোষজনক। অপারেশন সফল হওয়ায় ইতির পরিবার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের লিভার ট্রান্সপ্লান্ট টিমের চিকিৎসক, নার্স ও সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে আর্থিক সহায়তা ও রক্ত দিয়ে যারা এই সংগ্রামে পাশে ছিলেন, তাদের প্রতিও আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়েছে পরিবার।

এক বোনের প্রতি আরেক বোনের অকৃত্রিম ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও আত্মত্যাগের এই গল্প ইতোমধ্যেই দেশজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে। সবার একটাই প্রত্যাশা—দ্রুত সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসুক দুই বোন এবং তাদের পরিবারে ফিরে আসুক স্বস্তি ও আনন্দের পূর্ণতা।* ছবি সংযুক্ত আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *