পাত্রী চাই বিজ্ঞাপনের প্রলোভনে কোটি টাকা খোয়ালেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের নারী উপ সচিব

সেখ রাসেল, দপ্তর সম্পাদক:
পাত্রী চাই বিজ্ঞাপনের প্রলোভনে কোটি টাকা খোয়ালেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এক নারী উপ সচিব। যা বর্তমানে নেট দুনিয়ায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
পত্রিকায় ‘পাত্রী চাই’ বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে পরিচয়, এরপর বিয়ের প্রলোভন-শেষ পর্যন্ত প্রতারণার শিকার হয়ে প্রায় এক কোটি টাকা খুইয়েছেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এক নারী উপসচিব। পরে ভুক্তভোগী দুটি মামলা করেন। একটি প্রতারণার অভিযোগে ও অপরটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে। পরবর্তীতে অভিযুক্ত মো. মনিরুজ্জামানকে আটক করে পুলিশ। বর্তমানে তাকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।

মামলা সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী নারী বর্তমানে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হিসাবে কর্মরত। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, অভিযুক্ত মনিরুজ্জামান নিজেকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে ২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর পত্রিকায় ‘ডিভোর্সি বা বিধবা পাত্রী চাই’ বিজ্ঞাপন দেন। ওই বিজ্ঞাপনের সূত্র ধরে ওই নারী যোগাযোগ করলে মনিরুজ্জামান নিজেকে ‘অগ্রণী গ্রুপ অব কোম্পানির’ করপোরেট হেড এবং একজন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে পরিচয় দেন। পরে মোবাইল ফোনে নিয়মিত যোগাযোগ ও বিভিন্ন স্থানে দেখা-সাক্ষাতের মাধ্যমে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে তাদের। মনিরুজ্জামান বিয়ের প্রলোভন দিয়ে ওই উপসচিবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থানে দেখা-সাক্ষাতের মাধ্যমে তার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেন। ঘনিষ্ঠতার এক পর্যায়ে আসামি তাকে সিলেটে নিয়ে গিয়ে শারীরিক সম্পর্ক করেন। পরে আসামি ঢাকায় মিরপুর মডেল থানাধীন একটি আবাসিক ভবনেও একাধিকবার তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করেন। একই সঙ্গে কৌশলে ভুক্তভোগীকে সাভারের আবাসিক প্লটে বাড়ি নির্মাণে উদ্বুদ্ধ করেন। বিয়ের আশ্বাসে বিশ্বাস করে ভুক্তভোগী নারী বিভিন্ন সময়ে নিজের ব্যাংক হিসাব থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা তার কাছে পাঠান।

মামলার এজাহার অনুযায়ী, জনতা ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকের দুটি হিসাব থেকে মোট ৭২ লাখ ৮৫ হাজার ৭০০ টাকা আইএফআইসি ব্যাংকের একটি হিসাবে পাঠানো হয়। এছাড়া নগদসহ বিভিন্ন মাধ্যমে আরও প্রায় ১০ লাখ টাকা দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে প্রতারিত অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৮২ লাখ টাকা। কিন্তু বাড়ি নির্মাণ কাজে গড়মিল দেখা দিলে এবং বিয়ের বিষয়ে চাপ দিলে মনিরুজ্জামান টালবাহানা শুরু করেন। একপর্যায়ে তিনি বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানান এবং গৃহীত টাকার হিসাব দিতেও অস্বীকার করেন। উলটো বিষয়টি নিয়ে চাপ দিলে ক্ষতির হুমকি দেন বলেও অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী। এজাহারে বলা হয়, অভিযুক্ত ব্যক্তি চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি ও ১৮ ফেব্রুয়ারি একই পত্রিকায় আবারও ‘পাত্রী চাই’ বিজ্ঞাপন দেন। একই কৌশলে আরও অনেককে প্রতারণার ফাঁদে ফেলতে সক্রিয় রয়েছেন তিনি।

এ বিষয়ে ওই নারী উপসচিব গণমাধ্যমে কে বলেন, ‘আমি বিষয়টি নিয়ে খুবই আপসেট। আমি খুব অসুস্থ হয়ে গেছি। এ বিষয়ে আমি পরে কথা বলব।’ ভুক্তভোগীর আইনজীবী জিয়াউল হক সুমন বলেন, আসামি ভুক্তভোগীর সরলতার সুযোগ নিয়ে প্রতারণা করেছে। সুস্পষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।

আসামিপক্ষের আইনজীবী কাজী মেহেদী হাসান গণমাধ্যমে কে বলেন, আসামিপক্ষের আইনজীবী হিসেবে আমি সবসময়ই বলব যে, আমার মক্কেল নির্দোষ। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ করা তদন্তকারী কর্মকর্তার দায়িত্ব। তদন্ত শেষে যখন রিপোর্ট আদালতে জমা হবে, তখন সাক্ষ্য, জেরা ও আইনগত যুক্তিতর্কের মাধ্যমে বিষয়টির বিচার হবে। এটি সম্পূর্ণ বিচারিক বিষয় এবং শেষ পর্যন্ত আদালতই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন।

আইনজীবী মেহেদী হাসান আরও বলেন, অভিযোগকারী বলছেন প্রায় ৮২ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭২ লাখ টাকা ব্যাংকের মাধ্যমে এবং প্রায় ১০ লাখ টাকা নগদে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। নগদ টাকার ক্ষেত্রে যেহেতু কোনো ডকুমেন্ট বা প্রমাণ নেই, সে বিষয়ে এই মুহূর্তে মন্তব্য করা কঠিন। আর ব্যাংক লেনদেনের বিষয়ে আমাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ওই টাকা একটি বাড়ি নির্মাণের কাজের জন্য দেওয়া হয়েছিল। বাড়ির নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল এবং ইতোমধ্যে কলামও তোলা হয়েছে। এ অবস্থায় উভয়পক্ষের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা মতবিরোধ তৈরি হয়। তাদের পরিচয় হয়েছিল পত্রিকায় দেওয়া ‘পাত্রী চাই’ বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে। পরে তাদের মধ্যে বিয়েসংক্রান্ত আলোচনা হয়েছিল বলে জানা গেছে। একপর্যায়ে অভিযোগকারী বলেন, যদি বিয়ে না করা হয় তাহলে নির্মাণ কাজের হিসাব বুঝিয়ে দিতে হবে। কিন্তু তখন কাজ চলমান অবস্থায় ছিল, তাই সঙ্গে সঙ্গে হিসাব দেওয়া সম্ভব হয়নি। এই পরিস্থিতির মধ্যেই মামলাটি দায়ের করা হয়েছে।

মিরপুরের ঘটনায় মামলা সম্পর্কে তিনি বলেন, অভিযোগকারী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(১) ধারায় একটি মামলা করেছেন। যেখানে বলা হয়েছে, বিয়ের প্রলোভন দিয়ে তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করা হয়েছে কিন্তু পরে বিয়ে করা হয়নি। তবে মামলার বর্ণনায় নির্দিষ্ট কোনো তারিখ বা ঘটনার বিস্তারিত উল্লেখ নেই।

মামলার বর্ণনার একটি অংশে উল্লেখ আছে, তিনি কাজের হিসাব চেয়েছিলেন এবং বিয়ের বিষয়ে প্রস্তাব দিয়েছিলেন। অর্থাৎ বিষয়টি সেখানে স্বীকার করা হয়েছে যে, বিয়ে না হওয়াকে কেন্দ্র করেই বিরোধের সূত্রপাত। এ মামলায় বর্তমানে আমার মক্কেল আদালত থেকে জামিনে আছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *