ঠাকুরগাঁও জেনারেল হাসপাতাল: রক্তদাতার হাতে ‘ছেঁড়া বাল্ব’ ও অব্যবস্থাপনার নগ্ন রূপ
জসীমউদ্দীন ইতি ঠাকুরগাঁও।
একটি জেলার চিকিৎসাসেবার সর্বোচ্চ আশ্রয়স্থল হলো ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল। ঠাকুরগাঁওসহ আশপাশের কয়েক লাখ মানুষের ভরসার কেন্দ্রবিন্দু এই প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু সাম্প্রতিক এক চিত্র আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আধুনিক ভবন আর কোটি কোটি টাকার সরকারি বরাদ্দের আড়ালে সেবার মান কতটা জরাজীর্ণ হতে পারে। হাসপাতালের রক্ত সংগ্রহ কক্ষে রক্তদাতার হাতে বলের পরিবর্তে দেওয়া হচ্ছে রক্তচাপ মাপার (বিপি) মেশিনের একটি পরিত্যক্ত, নোংরা এবং ফেটে যাওয়া রাবারের বাল্ব। এই দৃশ্যটি কেবল একটি ছোট সরঞ্জামের অভাব নয়, বরং এটি হাসপাতালের সামগ্রিক তদারকি আর অব্যবস্থাপনার এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।
রক্তদান একটি মানবিক ও মহৎ কাজ। একজন রক্তদাতা যখন নিজের শরীর থেকে রক্ত দিয়ে অন্য একজনের জীবন বাঁচাতে এগিয়ে আসেন, তখন হাসপাতালের দায়িত্ব হলো তাকে ন্যূনতম সম্মানজনক ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশে সেবা প্রদান করা। কিন্তু ঠাকুরগাঁও জেনারেল হাসপাতালের রক্ত সংগ্রহ কক্ষের চিত্রটি ঠিক তার উল্টো। রক্ত প্রবাহ সচল রাখতে রক্তদাতার হাতের মুষ্টিতে যে ‘স্ট্রেস বল’ থাকার কথা, তার বদলে দেওয়া হচ্ছে এমন একটি বস্তু যা কোনো সুস্থ ও রুচিশীল মানুষের পক্ষে স্পর্শ করাও কঠিন। নোংরা ও জরাজীর্ণ সেই রাবারের বাল্বটি দেখে মনে হয়, এটি কোনো ময়লার ভাগাড় থেকে কুড়িয়ে আনা হয়েছে। এটি কি কেবলই সরঞ্জামের অভাব, নাকি রক্তদাতাদের প্রতি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চরম অবজ্ঞা?
হাসপাতালের নিয়ম অনুযায়ী, একজন রোগীর স্বজনকে রক্তের ব্যাগটি বাইরে থেকে চড়া দামে কিনে আনতে হয়। এরপর সরকারি নিয়ম মেনে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা ফি জমা দিয়ে রক্ত সংগ্রহ করতে হয়। অর্থাৎ, সেবাটি মোটেও বিনামূল্যে নয়। যেখানে প্রতিদিন কয়েক ডজন মানুষ রক্ত দিচ্ছেন এবং প্রতিবারই অর্থ জমা পড়ছে, সেখানে মাত্র কয়েকশ টাকা দিয়ে এক সেট মানসম্মত ‘সফট বল’ বা সরঞ্জাম কেনা কি খুব অসম্ভব কাজ? একটি ২৫০ শয্যার হাসপাতালে যেখানে কয়েক কোটি টাকার বাজেট থাকে, সেখানে সামান্য কিছু বলের অভাব থাকাটা হাস্যকর এবং লজ্জাজনক। এটি কোনোভাবেই আর্থিক সংকটের বিষয় হতে পারে না; এটি নিখাদ সদিচ্ছার অভাব এবং দায়িত্বশীলদের চরম উদাসীনতা।
হাসপাতাল হলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা আর জীবাণুমুক্ত সেবার জায়গা। কিন্তু রক্তদাতার হাতে যে পুরনো ও ফাটা বাল্বটি দেওয়া হচ্ছে, তা কতটুকু জীবাণুমুক্ত? বছরের পর বছর ধরে শত শত মানুষ একই নোংরা বস্তু হাত দিয়ে চেপে ধরছেন। এতে চর্মরোগসহ বিভিন্ন সংক্রমণের ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এই ছোট ছোট অনিয়ম আর অবহেলাই ধীরে ধীরে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা ধসিয়ে দেয়। যখন একজন সচেতন মানুষ এমন দৃশ্য দেখেন, তখন তিনি হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটের পরিচ্ছন্নতা নিয়েও সন্দিহান হয়ে পড়েন।
আমরা অবাক হই এই ভেবে যে, হাসপাতালের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চোখে কি এই ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি কখনও পড়েনি? নাকি তারা সাধারণ মানুষের ভোগান্তি দেখেও না দেখার ভান করে থাকেন? ঠাকুরগাঁওয়ের সচেতন নাগরিক সমাজ ও ভুক্তভোগীরা দীর্ঘ দিন ধরে সেবার মান বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু ছোট ছোট এই জরাজীর্ণ দৃশ্যগুলো প্রমাণ করে যে, পরিবর্তনের হাওয়া হাসপাতালটির অন্দরমহলে এখনও পৌঁছায়নি।
আমরা স্বাস্থ্য বিভাগ ও ঠাকুরগাঁও জেনারেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি—অনতিবিলম্বে রক্ত সংগ্রহ কক্ষের এই জরাজীর্ণ অবস্থা দূর করা হোক। পরিত্যক্ত বিপি মেশিনের বাল্ব সরিয়ে সেখানে আধুনিক ও উন্নত সরঞ্জাম নিশ্চিত করা হোক। সরকারি হাসপাতাল যেন কেবল ভবন আর বাজেটের প্রদর্শনী না হয়ে ওঠে, বরং সাধারণ মানুষের জন্য প্রকৃত সেবার একটি নির্ভরযোগ্য ঠিকানা হয়ে দাঁড়ায়। অবহেলা আর অব্যবস্থাপনার এই সংস্কৃতি থেকে ঠাকুরগাঁও ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালকে মুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।

