ঠাকুরগাঁওয়ের লিচু ও ২০ হাজার টনের স্বপ্ন: সম্ভাবনা বনাম বাস্তবতা

জসীমউদ্দীন ইতি ঠাকুরগাঁও।
উত্তরের শান্ত জনপদ ঠাকুরগাঁও এখন সেজেছে এক পীত-সবুজ সাজে। বসন্তের বিদায় আর গ্রীষ্মের আগমনে জেলার প্রতিটি লিচু বাগান এখন মৌমাছির গুঞ্জনে মুখরিত। যেদিকে চোখ যায়, গাছে গাছে কেবল মুকুলের ভার। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে জেলায় ২০ হাজার মেট্রিক টন লিচু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই সংখ্যাটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং ঠাকুরগাঁওয়ের কয়েক হাজার কৃষক, বাগানমালিক এবং মৌসুমি ব্যবসায়ীর ভাগ্য পরিবর্তনের এক বিশাল মানচিত্র।

আপনারা জানেন, ঠাকুরগাঁওয়ের মাটি ও আবহাওয়া লিচু চাষের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। বিশেষ করে সদর উপজেলা, বালিয়াডাঙ্গী এবং পীরগঞ্জ এলাকার বাগানগুলোতে লিচুর যে ফলন হয়, তা গুণগত মানে দেশের যেকোনো প্রান্তের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আমাদের গর্বের ‘বেদানা লিচু’ আজ ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃত। এর পাতলা চামড়া, ছোট আঁটি এবং অতুলনীয় মিষ্টি রস একে আভিজাত্যের প্রতীক করে তুলেছে। কিন্তু এই প্রাচুর্যের আড়ালে যে সম্ভাবনা ও সংকটগুলো লুকিয়ে আছে, একজন সংবাদকর্মী হিসেবে সেদিকে আলোকপাত করা আজ জরুরি।

২০ হাজার টন লিচুর লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলে স্থানীয় অর্থনীতিতে কয়েকশ কোটি টাকার প্রাণসঞ্চার হবে। লিচু পাড়া, বাছাই করা, খাঁচা তৈরি এবং পরিবহনের কাজে যুক্ত হবে কয়েক হাজার শ্রমিক। এতে গ্রামীণ কর্মসংস্থান যেমন বাড়বে, তেমনি প্রান্তিক মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিশাল উৎপাদন কি শেষ পর্যন্ত কৃষকের মুখে হাসি ধরে রাখতে পারবে?

আমাদের প্রধান সমস্যা হলো পচনশীল এই ফলের যথাযথ সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাব। লিচু গাছ থেকে নামানোর পর খুব অল্প সময় সতেজ থাকে। ঠাকুরগাঁওয়ে কোনো বিশেষায়িত হিমাগার বা আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র না থাকায় কৃষকরা অনেক সময় ‘প্যানিক সেলিং’ বা আতঙ্কে কম দামে ফল বিক্রি করে দেন। মধ্যস্বত্বভোগী বা ফড়িয়ারা এই সুযোগটাই নেয়। তারা মাঠ পর্যায়ে সিন্ডিকেট তৈরি করে নামমাত্র মূল্যে বাগান কিনে নেয়, আর সেই ফলই ঢাকার বাজারে কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি হয়। ফলে ঘাম ঝরানো কৃষক বঞ্চিতই থেকে যায়।

দ্বিতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। বর্তমানে যে হারে তাপমাত্রা বাড়ছে, তাতে লিচুর ‘ফেটে যাওয়া’ বা গুটি ঝরে পড়ার শঙ্কা থেকেই যায়। যদিও কৃষি বিভাগ পরামর্শ দিচ্ছে, কিন্তু অনেক প্রান্তিক চাষির কাছে আধুনিক সেচ প্রযুক্তি বা সঠিক বালাইনাশকের জ্ঞান এখনো পৌঁছায়নি। ড্রিপ ইরিগেশন বা আধুনিক স্প্রে মেশিন ব্যবহারের সুযোগ বাড়াতে না পারলে প্রতিকূল আবহাওয়ায় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।

ঠাকুরগাঁওয়ের লিচু শিল্পকে বাঁচাতে হলে আমাদের কেবল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ভাবলে চলবে না, বিপণন ও রপ্তানির দিকে নজর দিতে হবে।

১. রপ্তানি বাজার সৃষ্টি: ঠাকুরগাঁওয়ের বেদানা ও চায়না-৩ লিচু মধ্যপ্রাচ্যসহ ইউরোপের বাজারে রপ্তানি করার বিশাল সুযোগ রয়েছে। এর জন্য ‘গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস’ (GAP) নিশ্চিত করতে হবে।
২. প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প: সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে লিচুর জুস, জ্যাম বা ক্যানিং ফ্যাক্টরি স্থাপন করা গেলে উদ্বৃত্ত ফল অপচয় হবে না।
৩. পরিবহন সুবিধা: লিচু মৌসুমে বিশেষ ‘ম্যাঙ্গো স্পেশাল’ ট্রেনের মতো ‘লিচু স্পেশাল’ ট্রেনের ব্যবস্থা করা গেলে সরাসরি ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে লিচু পাঠানো সহজ হবে।

ঠাকুরগাঁওয়ের ২০ হাজার টন লিচুর স্বপ্ন সার্থক করতে হলে কৃষক, কৃষি বিভাগ এবং প্রশাসনকে একযোগে কাজ করতে হবে। আমরা চাই না আমাদের লিচু কেবল উৎসবের অংশ হোক, আমরা চাই এটি আমাদের জেলার স্থায়ী অর্থনৈতিক ভিত্তি হয়ে উঠুক। কৃষকের শ্রম যেন মধ্যস্বত্বভোগীর পকেটে না যায়, সেটি নিশ্চিত করাই হোক এবারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের মূল সার্থকতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *