দেশবাসী আরও যেসব চমক দেখার অপেক্ষায়
বিশেষ প্রতিনিধি:
ত্রয়োদশ প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেওয়ার প্রথম দিন থেকে তারেক রহমান একের পর এক চমক দেখাচ্ছেন। ইতোমধ্যে পার হয়েছে সাত কার্যদিবস। তবে প্রতিটি দিন ছিল বিএনপি সরকার ও দেশবাসীর জন্য বেশ গৌরবের। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এমন কিছু ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা নজিরবিহীন। আমার মতো অনেকে আপাতদৃষ্টিতে ধরেই নিয়েছেন-এভাবে চমক দেখানো অব্যাহত থাকলে বিএনপি সরকারের পুরো মেয়াদটি নতুন এক ইতিহাস হতে পারে। তবে সেজন্য শর্ত হলো-প্রধানমন্ত্রীকে জনস্বার্থের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এখনই কঠোর ও কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে চমক দেখাতেই হবে।
প্রধানমন্ত্রী অফিসে আসছেন ঘড়ি ধরে সকাল ৯টায়। শুধু নিজেই এমন নিয়ম মানছেন, তা কিন্তু নয়। মন্ত্রিসভার সদস্য ও সচিবরা সময়মতো অফিসে আসছেন কি না, সেটিও মনিটর করছেন। এর মধ্যে মঙ্গলবার অপহৃত এক স্কুলছাত্রকে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে এক ঘণ্টার মধ্যে উদ্ধার করার ঘটনাও বেশ আলোচিত ও প্রশংসিত। এর আগে শনিবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ঘটল আরেক অভাবনীয় এক মানবিক ঘটনা। উনিশ বছর আগের পরিচিত সাধারণ এক কর্মচারী নূরকে নাম ধরে ডেকে বলেন, ‘তুই নূর না?’ বাকিটা বর্ণনাতীত। আবেগঘন এক আবহ। আনন্দাশ্রু নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ছুটে আসেন নূর। ওই ঘটনাও এখন মানুষের মুখে মুখে। সবাই বলছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খুবই মানবিক একজন মানুষ এবং সব সময় নিজেকে সাধারণ একজন নাগরিক ভাবতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
যদিও তারেক রহমানের এমন সব চমকের যাত্রা শুরু হয়েছিল সংসদ-সদস্য (এমপি) হিসাবে শপথ নেওয়ার পরপরই। সংসদীয় দলের বৈঠকে তিনি সাফ জানিয়ে দেন, তার দলের এমপিরা সরকারি সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট নেবেন না। এমন খবর ছিল সবার কাছে অবিশ্বাস্য। কিন্তু এটিই এখন বাস্তব।
প্রধানমন্ত্রীর এমন অভূতপূর্ব সব সিদ্ধান্ত এখন টক অব দ্য কান্ট্রি। সবার মুখে মুখে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুনাম। দেশের বেশির ভাগ মানুষ এ মুহূর্তে তাকে সত্যিকারের ‘জনতার রাষ্ট্রনায়ক’ হিসাবে মূল্যায়ন করছেন। অনেকের কাছে এমন একজন প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই স্বপ্নের মধ্যে ছিল। সাধারণ মানুষ এখন প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন। অনেকে ধরেই নিয়েছেন, তার এই চমক দেখানো অব্যাহত থাকবে।
সাবেক প্রধান বিচারপতি ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ২০১০ সালের ৬ অক্টোবর ব্র্যাকের এক সেমিনারে বক্তব্য দিতে গিয়ে খুবই আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘দেশ এখন বাজিকরদের হাতে। চাঁদাবাজ, দুর্নীতিবাজ, টেন্ডারবাজ ও দুর্বৃত্তরা রাষ্ট্রব্যবস্থাকে চরম অবক্ষয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। যেখানে সর্বগ্রাসী বাজিকররা ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করছে।’ এরও অনেক বছর আগে ১৯৮২ সালে প্রয়াত কবি শামসুর রাহমান লিখেছিলেন, ‘অদ্ভুত উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’। এই শিরোনামে তার বিখ্যাত প্রতিবাদী কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। প্রশ্ন হলো-আমরা কি আজও এই ঘেরাটোপ থেকে মুক্ত হতে পেরেছি।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর সন্ত্রাস আবির্ভূত হয় ‘মব’রূপে। আর চাঁদাবাজি ভিন্ন লেবাসে ফিরে আসে মাত্র ৭২ ঘণ্টার বিরতি দিয়ে। বেপরোয়া হয়ে ওঠে সর্বগ্রাসী চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট। যাদের কোনোভাবেই দমন করতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু এখন তো নির্বাচিত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায়। ফলে ভুক্তভোগীসহ সাধারণ মানুষ এখন আর কোনো অজুহাত মেনে নেবে না। চাঁদাবাজ যারাই হোক, তাদের একমাত্র পরিচয় হবে অপরাধী। এরা যদি এখনো আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়ে যায়, তাহলে সরকার এ দায় থেকে কোনোভাবে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারবে না। এটিকে বড় ব্যর্থতা হিসাবে চিহ্নিত করে সাধারণ মানুষ সরকারের দিকে আঙুল তুলবে। তবে আশার কথা-নির্বাচিত হওয়ার পর সরকারদলীয় বেশ কয়েকজন এমপি সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। এমনকি নিজ দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা-সব এমপির মধ্যে এমন দেশপ্রেম ও চেতনা কাজ করতে হবে।
যত কঠিন চ্যালেঞ্জ হোক না কেন, সরকারকে যে কোনো মূল্যে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রেখে মুদ্রাস্ফীতি কমিয়ে আনতে হবে। এজন্য সবার আগে প্রয়োজন সমাজ এবং বাজার থেকে সব ধরনের সিন্ডিকেট শক্ত হাতে প্রতিহত করা। নিশ্চয় আওয়ামী লীগ সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির আলোচিত মন্তব্যের কথা অনেকের মনে আছে। সময়টা ২০২৩ সালের আগস্ট মাস। টিপু মুনশি সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, সিন্ডিকেট আছে; কিন্তু সিন্ডিকেটে হাত দেওয়া যাবে না। হাত দিলে বিপদ হবে। এ নিয়ে একই বছরের ১১ মে আরও খোলামেলা কথা বলেন শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার। তিনি বলেন, ‘অর্থনীতি ও বাজারে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, এই সিন্ডিকেট যদি আমরা ধরতে না পারি তাহলে আমাদের মতো লোকের মন্ত্রী থাকা উচিত না।’ ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের কর্মশালায় বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘মানুষ বাজারে গিয়ে কাঁদছে। অথচ বাজার সিন্ডিকেট আমরা ভাঙতে পারছি না। শুধু তাই নয়, আমলারা যা বলেন, মন্ত্রীদের সেটাই করতে হয়। মন্ত্রী দুর্বল আর সচিব সবল হলে সেখানে মন্ত্রীর কোনো ভূমিকা থাকে না।’
বাস্তবতা হলো-সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সব জানলেও চিহ্নিত সিন্ডিকেটদের বিরুদ্ধে কার্যত কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেননি, বা নেননি। কারণ, সত্যটা হলো-সিন্ডিকেট অলিগার্করা ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অতিঘনিষ্ঠ। এখন প্রশ্ন হলো-৫ আগস্ট সরকার পতনের পর ওই সিন্ডিকেটরা কি সব শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতে পালিয়ে গেছে? নিশ্চয় না। উত্তরটা হলো-সিন্ডিকেট বহাল তবিয়তে আছে। যাদের বিরুদ্ধে ‘হুক্কাহুয়া’ ডাক তোলা অন্তর্বর্তী সরকারও কিছুই করতে পারেনি। সংগত কারণে এসব শক্তিধর অবিনশ্বর সিন্ডিকেট সদস্যদের গলায় ঘণ্টা কাউকে না কাউকে বাঁধতেই হবে।
সাধারণ মানুষসহ ভোটারদের প্রত্যাশা-এই কঠিন কাজটি সাহসের সঙ্গে অবশ্যই করে দেখাতে পারবেন জনতার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আর সত্যিই যদি তিনি করতে পারেন, তাহলে এটিই হবে বিএনপি সরকারের অন্যতম চমক।
নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, পাবিলক সার্ভিস কমিশন ও মানবাধিকার কমিশনসহ প্রতিটি কমিশন যাতে সরকারের কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই আইন ও বিধির মধ্যে থেকে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে, সে নিশ্চয়তা দৃশ্যমান হতে হবে। প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয় এমন অভয় ও নির্দেশনা ইতোমধ্যে দিয়ে দিয়েছেন। এর ফলে আপনার মন্ত্রিসভাসহ নির্বাচিত এমপিদের মধ্যে কারও বিরুদ্ধে যদি দুর্নীতি দমন কমিশনে অনুসন্ধান, তদন্ত কিংবা মামলা চলমান থাকে, সেটিও দুদক বাধাহীনভাবে করতে পারবে। একই সঙ্গে প্রশাসনকে দলীয়করণমুক্ত করতেই হবে। আমরা আশা করতে চাই, ভবিষ্যতে আপনার সরকারের বিরুদ্ধে কেউ দলীয়করণের অভিযোগ তথ্যপ্রমাণ দিয়ে উপস্থাপন করতে পারবে না।
ব্যাংক লুটেরাদের কী হবে? এই মাফিয়াদের ফাঁদে আটকা পড়েছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় এ চক্র ব্যাংক ও আর্থিক সেক্টরকে একেবারে ফোকলা বানিয়ে দিয়েছে। হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে। প্রশ্ন হলো-এ চক্রের প্রত্যেকের প্রাপ্য শাস্তি নিশ্চিত হবে তো। নিশ্চয় ভোটাররাও এ ব্যাপারে আপনার কঠোর হস্তক্ষেপ দেখতে চায়।
দল ও সরকারের মধ্যে যৌক্তিক ব্যবধান তৈরি করা। ক্ষমতার অপব্যবহার করে দলীয় নেতাকর্মীরা যেন কোনোভাবে সরকার তথা আপনার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে না পারে, সে ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে নিশ্চয় আপনার পরিকল্পনা আছে। জনগণ চায়, বিএনপির নেতাকর্মীরা গণমুখী পরিচ্ছন্ন রাজনীতির চর্চা বেশি করে করুক। জনগণের কাছে জনসেবার ভিশন ও মিশন আরও স্পষ্ট করে দলকে একটি রাজনৈতিক ইনস্টিটিউশনে পরিণত করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী, আপনি চাইলে রাজনীতিমুক্ত ঐক্যবদ্ধ সাংবাদিক ইউনিয়ন গড়ে তোলার মহতী উদ্যোগ নিতে পারেন। পেশাদার সাংবাদিকদের এটি দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা। কিন্তু সুবিধাভোগী রাজনীতির অফুরন্ত হাতছানির মধ্যে সাধারণ সাংবাদিকরা বড় অসহায়। তারা দলীয় প্রভাবে দুষ্ট একশ্রেণির সাংবাদিকের নাগপাশ থেকে বের হয়ে রাজনীতিমুক্ত পেশাদার সাংবাদিকদের শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে পারেনি। আপনি প্রধানমন্ত্রী, চাইলে আপনার উদ্যোগে এ কাজটি খুব ভালোভাবে হতে পারে। এর ফলে জনস্বার্থ সুরক্ষায় গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা আরও শক্তিশালী হবে। সেটি করা সম্ভব হলে গণতন্ত্র এবং আপনার মতো গণতন্ত্রকামী রাজনৈতিক দলগুলো সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে। এটিও কম চমক হবে না।
একইভাবে শিক্ষকসহ দেশের আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পেশাকে দলীয় লেজুড়বৃত্তির বেড়াজাল থেকে মুক্ত করতে হবে। তা না হলে দেশ সত্যিকারার্থে সামনে এগোতে পারবে না।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জন্য কোনো চাপ হবে না। কারণ, সাধারণ মানুষের এসব প্রত্যাশা পূরণে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কোনো অর্থের সংশ্লেষ নেই। শুধু আপনার ইচ্ছাশক্তিই যথেষ্ট। তাছাড়া সুস্থধারার সমাজ, রাষ্ট্র ও রাজনীতি গড়ে তোলার জন্য আপনার পরিকল্পনা শানিত হচ্ছে। একজন মানুষকে সফল হতে হলে তাকে তার স্বপ্নের চেয়ে বড় হতে হয়। নিশ্চয় আপনার মধ্যে সেটি আছে। অন্তত আপনার সাতটি কার্যদিবস বিশ্লেষণ করলে সেরকম ইঙ্গিত স্পষ্টত পাওয়া যায়।
প্রধানমন্ত্রী পারবেন, পারতেই হবে। কারণ, তিনি জনতার নেতা হতে চেয়েছেন। বিশেষ করে যে রক্তাক্ত জুলাই বিপ্লব আপনাকে ভোটের মাধ্যমে দেশসেবার এই যে বিশাল দায় ও দায়িত্ব দিয়েছে, তা প্রতিপালনে নিশ্চয় আপনি বদ্ধপরিকর। বিশেষ করে যে দুঃশাসন থেকে মুক্তি পেতে যারা জুলাই বিপ্লবে অকাতরে মূল্যবান জীবন দিয়ে গেল, তাদের রক্তের ঋণ পরিশোধের ভার তো আপনার কাঁধেই থাকছে।

