লবণাক্ততার আগ্রাসনে বিপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্য জলবায়ু পরিবর্তন, খাল ভরাট ও মানবসৃষ্ট সংকটে অস্তিত্ব হুমকিতে সুন্দরবন
সাইফুল ইসলাম কবির, সুন্দরবন থেকে ফিরে:
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গর্ব, বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ও বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন আজ এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। প্রকৃতির অপরূপ লীলাভূমি, জীববৈচিত্র্যের আধার এবং উপকূলীয় জনপদের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ এই বন ধীরে ধীরে হারাচ্ছে তার স্বাভাবিক প্রাণশক্তি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়া, খাল ভরাট হয়ে পড়া এবং মানবসৃষ্ট নানা অনিয়ম মিলিয়ে সুন্দরবনের অস্তিত্বই যেন প্রশ্নের মুখে।
লবণাক্ততার আগ্রাসন: নীরব বিপর্যয়
সুন্দরবনের ভেতরের নদী-খালে আগের মতো মিঠা পানির প্রবাহ নেই। উজানের পানি কমে যাওয়ায় লবণাক্ততা বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। বনের ভেতর পলিমাটি জমে প্রায় ৫০টির মতো খাল ভরাট হয়ে গেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। কোথাও কোথাও নতুন চর জেগে উঠেছে। ফলে পানির স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, যা বনজ উদ্ভিদ ও প্রাণিকুলের জন্য ভয়াবহ সংকেত।
অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে সুন্দরবনের প্রধান বৃক্ষ সুন্দরীসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রোগাক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। লবণ পানির প্রভাবে গাছের শিকড় দুর্বল হয়ে পড়ছে, পাতায় রোগ ছড়াচ্ছে। বন্যপ্রাণীরাও বিশুদ্ধ পানির অভাবে নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বনটির প্রাকৃতিক পুনর্জন্ম প্রক্রিয়াও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বিষাক্ত শিকার ও পাখির মৃত্যু
সুন্দরবনে অবাধে বন্যপ্রাণী শিকার এবং নদী-খালে কীটনাশক ছিটিয়ে মাছ ধরার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিষযুক্ত মাছ খেয়ে পাখি মারা যাচ্ছে অসংখ্য। খাদ্যচক্রে বিষক্রিয়ার প্রভাব পড়ছে অন্যান্য প্রাণীর ওপরও। ফলে জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে নষ্ট হচ্ছে।
এই বনই কিন্তু বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার–এর আবাসস্থল। পাশাপাশি হরিণ, কুমির, ডলফিন, নানা প্রজাতির পাখি ও সরীসৃপের নিরাপদ আশ্রয়। অথচ আজ সেই আশ্রয়স্থলই হুমকির মুখে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঢাল হয়ে দাঁড়ানো বন
দেশের সর্ব দক্ষিণ-পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর অববাহিকায় গড়ে ওঠা সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়; এটি উপকূলীয় মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও সুপার সাইক্লোনের আঘাতে নিজে ক্ষতবিক্ষত হলেও উপকূলবাসীকে রক্ষা করে চলেছে। প্রাকৃতিক দেয়াল হিসেবে এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। বিশ্বের একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে এর পরিবেশগত গুরুত্ব আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃত।
‘সুন্দরবন দিবস’: দাবি আছে, স্বীকৃতি নেই
সুন্দরবন রক্ষায় সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০০১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি খুলনায় প্রথম জাতীয় সুন্দরবন সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। রূপান্তর, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাপাসহ ৭০টি সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ওই সম্মেলনে বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে ‘সুন্দরবন দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং জাতীয়ভাবে দিবসটি ঘোষণার দাবি জানানো হয়।
২০০২ সাল থেকে বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা, পিরোজপুর ও বরগুনাসহ সুন্দরবনসংলগ্ন জেলাগুলোতে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। করোনাকালে ভার্চুয়ালি আলোচনা সভার আয়োজন করা হলেও ২১ বছরেও জাতীয়ভাবে ‘সুন্দরবন দিবস’ ঘোষণার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
খুলনার বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা গণমুখীর নির্বাহী পরিচালক লুৎফর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই জাতীয় স্বীকৃতির দাবি জানানো হচ্ছে, কিন্তু এখনো সাড়া মেলেনি। গবেষক পিযুষ বাউলিয়া পিন্টু জানান, “বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে সুন্দরবনকে ভালোবাসুন”—এই স্লোগান সামনে রেখে প্রতিবছরই দিবসটি পালন করা হয়।
পৃথক মন্ত্রণালয়ের দাবি
পরিবেশবিদ ও সংগঠকরা মনে করেন, সুন্দরবন সংরক্ষণ এবং বনসংলগ্ন মানুষের জীবন-জীবিকার মানোন্নয়নের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন প্রয়োজন। এতে সমন্বিত পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। তাদের মতে, সুন্দরবনের মতো বিশেষ ও স্পর্শকাতর বনাঞ্চলের জন্য আলাদা প্রশাসনিক কাঠামো সময়ের দাবি।
প্রধান বন সংরক্ষক আমীর হোসেন চৌধুরী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও জীবিকার চাপে সুন্দরবন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বন রক্ষায় স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা জরুরি। সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এখনই সময় সম্মিলিত উদ্যোগের
বিশেষজ্ঞদের মতে, খাল পুনঃখনন, মিঠা পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা, কীটনাশকের ব্যবহার বন্ধ, বন্যপ্রাণী শিকার রোধ এবং বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। পাশাপাশি জাতীয়ভাবে ‘সুন্দরবন দিবস’ ঘোষণা করে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি প্রয়োজন।
সুন্দরবন কেবল একটি বনভূমি নয়; এটি বাংলাদেশের পরিবেশ, অর্থনীতি ও উপকূলীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই বিশ্ব ঐতিহ্য রক্ষা করা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা। এখন প্রশ্ন একটাই—আমরা কি সময় থাকতে সচেতন হবো, নাকি ইতিহাসের দায় কাঁধে নিয়ে নীরব দর্শক হয়ে থাকবো?

