বিএনপির জয় ভারত বাংলােদেশ সম্পর্ক মজবুত হওয়ার সম্ভাবনা

প্রধান প্রতিবেদক:
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি জয়লাভ করেছে। শশী থারুরের আশঙ্কা সত্যি হয়নি। মোদি সরকারের আশঙ্কাও নয়। গত বছরের শেষের দিকে বাংলাদেশের বৃহত্তম ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জিততে শুরু করে, তখন দিল্লির কৌশলগত মহলে নিদ্রাহীন রাতের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল জামায়াতের উত্থান।

গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন শিবির জয়লাভ করার পর শশী থারুর প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছিলেন—এই ফলাফল আসন্ন সাধারণ নির্বাচনে কেমন প্রভাব ফেলতে পারে।

তিনি লিখেছিলেন, ‘এটি হয়তো অধিকাংশ ভারতীয়ের মনে তেমন কোনো আলোড়ন সৃষ্টি করেনি, তবে ভবিষ্যতের জন্য এটি একটি উদ্বেগজনক ইঙ্গিত।’ গতকাল (১২ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যার পর জামায়াত-নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটকে অনেক পিছনে ফেলে বিএনপি যখন বিজয়ের দিকে এগিয়ে যায়, তখন ভারতে অনেকে সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি সুযোগ দেখতে পান।

আপাতত ইসলামপন্থী হুমকি এড়ানো গেছে : দিল্লির উদ্বিগ্ন হওয়ার একাধিক কারণ ছিল। প্রথমত, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে জামায়াত পাকিস্তানকে সমর্থন করেছিল। পাশাপাশি ইসলামপন্থী এই দলটি শরিয়া আইন বাস্তবায়নের পক্ষেও কথা বলেছে।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে বক্তব্য দিতে গিয়ে জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের হুঁশিয়ারি দেন, ভারত যদি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ‘হস্তক্ষেপ করার সাহস দেখায়’, তবে পঞ্চাশ লাখ বাংলাদেশি তরুণকে নিয়ে ‘পবিত্র যুদ্ধ’ ঘোষণা করা হবে।

দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কের অবনতির প্রধান কারণ ছিল ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের উগ্রবাদের উত্থান রোধে অক্ষমতা—অথবা এতে তাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ। এর ফলে শুধু বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, বরং এর প্রভাব ভারতে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরপরই ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, জামায়াত দেশের শীর্ষ কওমি আলেমদের সঙ্গে একটি বৈঠক করেছে। বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে ইসলামি বিধানভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

ইসলামপন্থী শক্তির ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমির শরিয়ত মুফতি আবু জাফর কাসেমি বলেন, ‘আমাদের অতীতের সব মতপার্থক্য ভুলে যেতে হবে এবং কোনো রাজনৈতিক দলকে সুযোগ দেওয়া যাবে না।’

বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি দ্য প্রিন্টকে বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পেছনের ঘটনাপ্রবাহে জামায়াতে ইসলামী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ইউনূস সরকারের ওপর জামায়াত উল্লেখযোগ্য প্রভাব বজায় রেখেছিল, যা সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রতিফলিত হয়েছে।

দিল্লির উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছিল মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে জামায়াতের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা। ২০২৬ সালের ২৪ জানুয়ারির এক প্রতিবেদনে ইকোনমিক টাইমস লিখেছিল, নির্বাচনের আগে উগ্র ইসলামপন্থী দলটিকে কাছে টানার মার্কিন প্রচেষ্টা কূটনৈতিক মহল ও বাংলাদেশ-বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ভ্রূকুটি সৃষ্টি করেছে।

এর আগে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট ঢাকা অবস্থানরত এক মার্কিন কূটনীতিকের অডিও রেকর্ডিং সংগ্রহ করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে তিনি বর্ণনা করেছিলেন কীভাবে ওয়াশিংটন জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে চায়।

টানাপোড়েনপূর্ণ অতীত ভুলতে চাওয়া : শেখ হাসিনা সরকারের পতনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব তীব্রভাবে বেড়ে যায়। ভারত হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছে—এই বিষয়টি বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে ভালোভাবে গ্রহণযোগ্য হয়নি। হাসিনার শাসনামলে দুই দেশ ঘনিষ্ঠ কৌশলগত মিত্র ছিল। তবে তার অপসারণের পর দিল্লি-ঢাকা সম্পর্ক দ্রুত অবনতি ঘটে।

পরিস্থিতি রাতারাতি বদলাবে না। ২০০১-০৬ সময়কালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের জোটসঙ্গী ছিল জামায়াত। তখন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক সবচেয়ে খারাপ সময়গুলোর একটি অতিক্রম করে।

২০০৩ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা বীণা সিক্রি দ্য প্রিন্টকে বলেন, পাকিস্তানভিত্তিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশি ভূখণ্ড ব্যবহার করত। বাংলাদেশ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিদ্রোহীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছিল।

ফ্রন্টলাইন-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, তারেক রহমান তৎকালীন বিএনপি সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। তার কোনো আনুষ্ঠানিক পদ না থাকলেও বিপুল ক্ষমতা প্রয়োগ করতেন, কিন্তু কোনো জবাবদিহিতা ছিল না। ২০০৪ সালের চট্টগ্রাম অস্ত্র জব্দ মামলায় তার যুক্ত থাকার অভিযোগ ভারতের নিরাপত্তা মহল সহজে ভুলবে না। এটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অস্থিরতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসাম (উলফা)-এর সঙ্গে ষড়যন্ত্রের অংশ ছিল বলে গণ্য করা হয়।

ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিয়েছিলেন। সে সময় তিনি তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ইউনূস প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেই জয়শঙ্করের ঢাকা সফরটি হয়েছিল।

এখন বিএনপি ক্ষমতায় আসায় এবং জামায়াতের পরাজয়ের পর ভারত ও বাংলাদেশ নতুনভাবে শুরু করার আশা করতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *