জৈন্তাপুর ডিবি হাওরের লাল শাপলা পর্যটনের সৌন্দর্য হারাতে বসেছে কচুরিপানার আগ্রাসনে

সিলেট প্রতিনিধি : জৈন্তাপুর ডিবি হাওরের লাল শাপলা পর্যটনের সৌন্দর্য হারাতে বসেছে কচুরিপানার আগ্রাসনে। সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার সীমান্তঘেঁষা ডিবির হাওরের একাংশে অবস্থিত লাল শাপলা বিলে কচুরিপানার আগ্রাসনে এর সৌন্দর্য হুমকিতে রয়েছে বলে মনে করছেন পরিবেশ সংগঠকবৃন্দ। তারা অবিলম্বে এ বিলের নৈসর্গিক সৌন্দর্য রক্ষায় প্রতিবেশ পরিবেশের গুরুত্বের দিক বিবেচনা করে কচুরিপানার বিস্তার রোধ করে তা সংরক্ষণের দাবী জানান।
ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)। ধরা’র কেন্দ্রীয় উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য ও সিলেট কিডনি ফাউন্ডেশনের সভাপতি প্রফেসর ডা. জিয়া উদ্দিন আহমেদ-এর নেতৃত্বে পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষকদের একটি প্রতিনিধি দল শনিবার (২৪ জানুয়ারী ২০২৬ইং) সকালে ডিবির হাওর শাপলা বিল ও রাজা বিজয় সিংহের সমাধিসৌধ পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন দলে অন্যান্যের মধ্যে ছিলেন জার্মান প্রবাসী লেখক ও ঐতিহ্য গবেষক সাকি চৌধুরী, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ও ধরা কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক, ধরা সিলেটের আহ্বায়ক ডা. মোস্তফা শাহজামান চৌধুরী ও সদস্য সচিব আব্দুল করিম কিম এবং পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ট্রাস্টের অন্যতম ট্রাস্টি এডভোকেট গোলাম সোবাহান চৌধুরী।
পরিদর্শনকালে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন জৈন্তিয়া ফটোগ্রাফি সোসাইটির সভাপতি মোঃ খায়রুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক রেজওয়ান করিম সাব্বির ও সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল হোসেন মোঃ হানিফ পরিদর্শক দলকে স্থানীয় উদ্যোগে গড়ে ওঠা ‘তরুছায়া প্রকল্প’ সম্পর্কে অবহিত করেন। এ প্রকল্পের অধীনে বিলের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় তিন হাজার গাছ লাগানো হয়েছে।
প্রায় দেড় ঘন্টা শাপলা বিল এলাকা পরিদর্শন শেষে পরিদর্শক দল বিলের সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে সংবাদপত্রে প্রেরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, শাপলার বিলে কচুরিপানা যেভাবে বিস্তার লাভ করছে তাতে অচিরেই বিলের সার্বিক সৌন্দর্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মতবিনিময়কালে ডিবির হাওরের রাস্তার পাশে রোপণকৃত কিছু গাছ স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে অভিমত ব্যক্ত করা হয়। পরিদর্শনকালে রাজা বিজয় সিংহের সমাধিসৌধ সংরক্ষণের জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানানো হয় এবং শাপলা বিলের প্রাণপ্রকৃতি ও বাস্তুতন্তু সংরক্ষণের লক্ষ্যে কচুরিপানাসহ অন্যান্য প্রাণগত আগ্রাসন প্রতিরোধে নিয়মিত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়। এছাড়া প্রতিবেশ ও বাস্তুতন্তু বিবেচনায় এখানে হিজল, করচ, তাল, সুপারিসহ দেশীয় প্রজাতির বনজ, ফলজ ও ঔষধি গাছ লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
উল্লেখ্য ২০১০ সালের দিকে স্থানীয় অধিবাসীরা ডিবির হাওরের একাংশে ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারীর মধ্য পর্যন্ত ভোরের আলোয় ফুটন্ত লাল শাপলা ফুটতে দেখেন। ২০১৬ সালের দিকে স্থানীয় পর্যটকদের দৃষ্টি কাড়ে এ লাল শাপলার বিল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে এ লাল শাপলা বিলের মুগ্ধতার সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে দেশ বিদেশে। প্রতিবছরই বাড়তে থাকে পর্যটকদের আগমন। জৈন্তা-খাসিয়া পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত শাপলা বিলের নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিবছর ডিসেম্বর ফেব্রুয়ারী মাসে সূর্য ওঠা থেকে শুরু করে সকাল ১০ টা পর্যন্ত পর্যটকদের ভিড় থাকে। শুক্র, শনিবারসহ ছুটির দিনে পর্যটকদের সংখ্যা বেড়ে যায় কয়েকগুন। অথচ এখানে পর্যটকদের জন্য কোনো সুযোগ সুবিধা গড়ে ওঠেনি।
পরিদর্শক দলের নেতৃবৃন্দ মনে করেন, এ লাল শাপলার বিলকে কেন্দ্র করে কেবল প্রাকৃতিক পর্যটন কেন্দ্র নয় বিকশিত হতে পারে ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটন শিল্পও। কারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি বিলটি বহন করছে জৈন্তিয়ার রাজা বিজয় সিংহের স্মৃতি। ১৭৮৭ সালের দিকে জৈন্তিয়ার রাজা বিজয় সিংহকে হরফকাটা ও ডিবি বিলের মধ্যস্থল তথা কেন্দ্রী হাওরে ডুবিয়ে হত্যা করা হয়। আর এ স্থানেই প্রতিষ্ঠা করা হয় রাজা বিজয় সিং এর সমাধিসৌধ।
সিলেট ঐতিহ্য সংরক্ষণ ট্রাস্ট ও ধরিত্রী রক্ষায় আমরা(ধরা)র পরিদর্শক দল দু’শ বছরের পুরোনো সমাধি সৌধটি অযতেœ অবহেলায় পড়ে থাকতে দেখে মর্মাহত হন ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁরা সমাধি সৌধটি সংরক্ষণের দাবী জানান। অচিরেই সিলেট ঐতিহ্য সংরক্ষণ ট্রাস্ট এর পক্ষ থেকে রাজা বিজয় সিং এর হৃদয় বিদারক প্রয়াণ ও এতদসংক্রান্ত অসম প্রেমের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত ভাবে তুলে ধরতে বিল বোর্ড স্থাপন করবেন বলে জানান।
পরিদর্শকদল পর্যটকদের জন্য সুযোগ সুবিধা নিশ্চিতের পাশাপাশি শাপলা বিল ও এর চারপাশকে ময়লা আবর্জনামুক্ত রাখার উপর গুরুত্বারোপ করেন। এছাড়া পর্যটকদেরও দায়িত্বশীল আচরন প্রত্যাশা করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *