জামায়াত-শিবিরকে মিডিয়ায় ফোকাস করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র, জামায়াত কি তাহলে ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে

সেখ রাসেল, দপ্তর সম্পাদক:
হঠাৎ করে জামায়াতের সখ্যতা বেড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের, তাহলে কি জামায়তই ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে, এমন কিছু তথ্য উঠে এসেছে। ওয়াশিংটন পোস্টের হাতে আসা অডিও রেকর্ডিং থেকে জানা গেছে, ঢাকার একজন মার্কিন কূটনীতিক কীভাবে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়ে ওয়াশিংটনের আগ্রহের কথা বর্ণনা করেছেন। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী আগামী মাসের নির্বাচনে তাদের ইতিহাসের সেরা ফলাফল করতে যাচ্ছে—এমনটা আঁচ করতে পেরে মার্কিন কূটনীতিকরা দলটির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর তোড়জোড় শুরু করেছেন।

ঐতিহাসিকভাবে দলটি শরিয়া আইন প্রবর্তন এবং নারীদের ঘরের কাজের ও সন্তানদের দেখাশোনার সুবিধার্থে তাদের কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনার পক্ষে কথা বলে আসছিল। কুরআন অনুযায়ী অমুসলিমদের অধিকার নিশ্চিত করা, তাদের জান মাল সম্পদ রক্ষা করা। সম্প্রতি তারা নিজেদের ভাবমূর্তি কোমল করতে এবং জনসমর্থন বাড়াতে সচেষ্ট হয়েছে। বর্তমানে তারা বলছে যে, তাদের মূল লক্ষ্য হলো দেশ থেকে দুর্নীতি নির্মূল করা। বর্তমানে জামায়াত ইসলামের নেতা কর্মীরা শহর থেকে গ্রামের প্রায় প্রতিটি ঘরে পৌছে গিয়েছে, তারা জামায়াতের নীতি আদর্শকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছে। তাতে জনগণ তাদের ভবিষ্যতে কথা চিন্তা করে জামায়াত কে বেছে নিয়েছে, এমনই তথ্য উঠে এসেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এর কাছে। এমনও তথ্য পাওয়া গেছে অমুসলিমরা যেভাবে জামায়াতকে আপন করে নিয়েছে তা খুবই অবাক করার মতো। তাই নয় অনেকেই বাচার তাগিদে অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা পেতে বিএনপির সাথে মাঠে থাকলেও তারা ভোট দিবেন, জামায়াত কে এমন অনেক তথ্য উঠে এসেছে। সেই ১৯৭১ সাল থেকে এ পর্যন্ত কোন অমুসলিম জামায়াতের দারা ক্ষতিগ্রস্থ মামলা হামলা হয়েছে এমন নজির পাওয়া যায় না। তাছাড়া আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে, বিএনপিতে যারা মনোয়ান পায়নি তারা বিএনপির সাথে কাজ করলেও মূলত জামায়াতকে ভোট দেওয়ার মতো কিছু ইঙ্গিত দিয়ে যাচ্ছেন, তাদের সমর্থনকারী নেতা কর্মীদের।

বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মার্কিন কূটনীতিকরা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তারা পুনরুত্থিত এই ইসলামপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। অডিও রেকর্ডিং অনুযায়ী, গত ১ ডিসেম্বর ঢাকাভিত্তিক একজন মার্কিন কূটনীতিক নারী সাংবাদিকদের সাথে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বলেন যে, দেশটি এখন ‘ইসলামী ধারায় মোড় নিয়েছে’। ওই কূটনীতিক ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ‘আগে কখনো যা করতে পারেনি, তেমন ফলাফল (সেরা ফল) করবে।’

‘আমরা তাদের বন্ধু হিসেবে পেতে চাই,’ উল্লেখ করে ওই কূটনীতিক সাংবাদিকদের কাছে জানতে চান, তারা জামায়াতের প্রভাবশালী ছাত্র সংগঠনের সদস্যদের নিজেদের টকশো বা প্রোগ্রামে আমন্ত্রণ জানাবেন কি না। তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনারা কি তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন? তারা কি আপনাদের শো-তে আসবে?’

নিরাপত্তার খাতিরে ওয়াশিংটন পোস্ট ওই কূটনীতিকের নাম প্রকাশ করেনি। জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশে জোরপূর্বক কঠোর ইসলামী আইন বা শরিয়া চাপিয়ে দিতে পারে—এমন উদ্বেগ তিনি উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর মতে, ওয়াশিংটনের হাতে এমন প্রভাব বা ‘লিভারেজ’ আছে যা তারা প্রয়োজনে ব্যবহার করতে প্রস্তুত। ওই কূটনীতিক বলেন, ‘আমি মোটেও বিশ্বাস করি না যে জামায়াত শরিয়া চাপিয়ে দিতে পারবে।’ তিনি উল্লেখ করেন যে, দলটির নেতারা যদি উদ্বেগের কারণ হওয়ার মতো কোনো পদক্ষেপ নেন, তবে পরের দিনই যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর ‘১০০ শতাংশ ট্যারিফ বা বাণিজ্য শুল্ক’ আরোপ করবে।

ওয়াশিংটন পোস্টের কাছে পাঠানো এক বিবৃতিতে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র মনিকা শাই বলেন, ‘ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত সেই কথোপকথনটি ছিল মার্কিন দূতাবাস কর্মকর্তা এবং স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যকার একটি নিয়মিত ও ঘরোয়া (অফ-দ্য রেকর্ড) আলোচনা।’ তিনি আরও যোগ করেন যে, সেই বৈঠকে ‘অনেকগুলো রাজনৈতিক দল নিয়ে আলোচনা হয়েছে’ এবং ‘যুক্তরাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট দলের পক্ষ নেয় না। বাংলাদেশি জনগণের দ্বারা নির্বাচিত যেকোনো সরকারের সঙ্গেই তারা কাজ করবে।’

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর মার্কিন মুখপাত্র মোহাম্মদ রহমান এক বিবৃতিতে জানান, ‘একটি ব্যক্তিগত কূটনৈতিক বৈঠকে যেসব মন্তব্য করা হয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে, সেগুলোর প্রেক্ষাপট নিয়ে কোনো মন্তব্য না করাই শ্রেয় মনে করছি।’

মূলধারার রাজনীতিতে জামায়াতের প্রবেশ:
রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই বাংলাদেশ অস্থিরতার ভেতর দিয়ে গেছে। পরবর্তী দশকগুলোতে বাংলাদেশকে সহ্য করতে হয়েছে সামরিক অভ্যুত্থান, একনায়কতন্ত্র এবং প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল—হাসিনার আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যকার চরম বিশৃঙ্খল বেসামরিক শাসন। এর পাশাপাশি চীন ও ভারতের মতো শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখতেও দেশটিকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়েছে। উল্লেখ্য, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রায় আড়াই হাজার মাইলের বিশাল সীমান্ত রয়েছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ওপর কিছু সহিংস অপরাধের ঘটনা উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। জামায়াত দারা কোন অমুসলিম এখনও নির্যাতিত হয়নি। এমনকি আওয়ামীলীগ সরকার ভারতের সাথে বন্ধুত্ব থাকাকালে আওয়ামীলীগ ও বিএনপির নেতা কর্মীদের দারা হিন্দুরা আক্রমনের স্বীকার, জমি জায়গা দখল সহ নানাবিধ ঘটনা ঘটেছে। তবে অনেক হিন্দু ও অমুসলিমরা বলেছেন, জামায়াতের কেউ কখনও আমাদের কোন ক্ষতি করেনি।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ও একটি রাজনৈতিক উত্তরণের পথ তৈরি করতে সচেষ্ট। ২০২৪ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর মুহাম্মদ ইউনূস বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ একটি পরিবার। আমাদের এটিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে।’ গত সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, আসন্ন নির্বাচন অবাধ হবে এবং ঠিক সময়েই অনুষ্ঠিত হবে। তিনি লেখেন, ‘কে কী বলল তাতে কিছু যায় আসে না, নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারিতেই হবে—একদিন আগেও না, একদিন পরেও না।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, জামায়াতে ইসলামী এবার ক্ষমতার মুখ দেখতে যাচ্ছে। হাসিনার আমলে নিষিদ্ধ থাকার পর প্রচারণার সময় দলটি বেশ গতি পেয়েছে এবং অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটির রাজনীতি বিশেষজ্ঞ মুবাশ্বার হাসানের মতে, ‘জামায়াত এখন মূলধারার রাজনীতিতে চলে এসেছে।’

জামায়াতে ইসলামীর মার্কিন মুখপাত্র মোহাম্মদ রহমান এক বিবৃতিতে জানান, ‘একটি ব্যক্তিগত কূটনৈতিক বৈঠকে যেসব মন্তব্য করা হয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে, সেগুলোর প্রেক্ষাপট নিয়ে কোনো মন্তব্য না করাই শ্রেয় মনে করছি।’

জামায়াতে ইসলামীর মুখপাত্র মোহাম্মদ রহমান বলেন, তাদের দল ‘দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সুশাসনের’ প্রতিশ্রুতি নিয়ে লড়ছে। নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর প্রস্তাবটি এখনো ‘প্রাথমিক পর্যায়ে’ আছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, দলটির এখনই শরিয়া আইন কার্যকর করার কোনো পরিকল্পনা নেই। কারণ একদিনেই সব সম্ভব নয়। যখন হিন্দু মুসলিম বৈধ্য খ্রিষ্টান সহ নানা ধর্ম বর্ণের লোকেরা কুরআনের আইনের মর্ম বুঝবে তখন জনগণই বলবে শরীয়া আইন বাস্তবায়ন করা হোক। তবে সেদিন বেশি দূরে নয়।

এই নির্বাচনে জামায়াতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হলো বিএনপি। নির্বাচনে জয়ী হলে লন্ডনে দীর্ঘ প্রবাস জীবন কাটিয়ে গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরে আসা দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানই প্রধানমন্ত্রী হওয়ার চেষ্টা করছেন। বিএনপির কৌশল সম্পর্কে অবগত একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, তারেক রহমান ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করেন যে জামায়াত নির্বাচনে প্রত্যাশার চেয়েও ভালো করবে। তবে জয়ী হলেও তারেক রহমান কোনভাবেই জামায়াতকে নিয়ে কোনো কোয়ালিশন বা জোট সরকার গঠন করবেন না। কারণ তিনি ভারতের সাথে চুক্তিকরেই দেশে এসেছেন। কারণ উনি বিদেশে থাকতে ইসলামই মেনে চলেছেন এর কোন নজির পাওয়া যায় না।

জামায়াতে ইসলামীর আমীর বা প্রধান শফিকুর রহমান জানিয়েছেন যে, তিনি বিএনপির সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। গত জানুয়ারিতে তিনি রয়টার্সকে বলেছিলেন, ‘দলগুলো যদি ঐক্যবদ্ধ হয়, তবে আমরা একসাথেই সরকার চালাব।’ উল্লেখ্য, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারে জামায়াতে ইসলামী একটি ছোট অংশীদার হিসেবে ছিল।

২০২৪ সালে হাসিনার পতনের পর থেকে জামায়াতে ইসলামী ওয়াশিংটনে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে চারটি এবং ঢাকায় ‘বেশ কয়েকটি’ বৈঠক করেছে বলে ওয়াশিংটন পোস্টকে জানিয়েছেন দলটির মুখপাত্র মোহাম্মদ রহমান। এছাড়া গত শুক্রবার দলটির শীর্ষ নেতা মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ারের সঙ্গেও এক ভার্চুয়াল বৈঠকে মিলিত হন।

স্টেট ডিপার্টমেন্ট ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত ওইসব বৈঠক নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। ঢাকায় জামায়াতের সঙ্গে বৈঠকগুলোকে তারা ‘নিয়মিত কূটনৈতিক কাজের অংশ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর থেকেও এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

মোহাম্মদ রহমান আরও জানান, গত আগস্টে একজন ঊর্ধ্বতন ভারতীয় কূটনীতিক জামায়াত আমিরের ঢাকায় অবস্থিত বাসভবনে তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলেন, তখন আমির হার্ট সার্জারি শেষে সুস্থ হচ্ছিলেন। তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। ঢাকার ওই দূতাবাস বৈঠকে মার্কিন কর্মকর্তা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, কেবল জামায়াতে ইসলামীই নয়, দূতাবাস কর্মীরা অন্যান্য রক্ষণশীল ইসলামপন্থী দের সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারেন। ওই কূটনীতিক আরও বলেন, ‘আমরা তাদের বন্ধু হিসেবে পেতে চাই, যাতে আমরা প্রয়োজনে ফোনে কথা বলতে পারি।’ তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, জামায়াতে ইসলামী যদি ক্ষমতায় এসে এমন কোনো নীতি গ্রহণ করে যা ওয়াশিংটনের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বিশাল তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর পাল্টা ব্যবস্থা নেবে।

ওই কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, ‘তাদের দলে অধিকাংশ হাইয়ার এডুকেটেড পার্সন, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ও বুদ্ধিমান মানুষ আছেন, তারা সুন্দরভাবে দেশ পরিচালনা করতে পারবে বলে মন্তব্য করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন কর্মকর্তাদের এমন আশ্বাস তারা কয়েকটি জরিপ চালিয়েছে। তারই কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা গেছে।
কুগেলম্যান মনে করেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সম্পর্ক ‘ভালো অবস্থায় থাকত,’ তবে হয়তো আমেরিকানরা নির্বাচনের আগে জামায়াত নিয়ে ভারতের উদ্বেগের বিষয়টি মাথায় রাখত। কিন্তু বর্তমানে ‘দুই দেশের অংশীদারিত্বে চরম বিশৃঙ্খলা বিরাজ করায়, আমার মনে হয় না মার্কিন কর্মকর্তারা ভারতের উদ্বেগের বিষয়ে খুব একটা মনোযোগী বা সংবেদনশীল হওয়ার প্রয়োজন বোধ করবেন।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *