জনগণের প্রত্যাশা কার উপর? বিএনপি না জামায়াতে ইসলাম।

সেখ রাসেল, দপ্তর সম্পাদক:
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফেরার পর জনমনে এক ধরনের ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে। বিএনপি একক ভাবে ক্ষমতায় আসার মতো গণজুয়ার দেখা যাচ্ছে। কারণ ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ পালিয়ে গেছে। দলটির কার্যক্রমও নিষিদ্ধ। অন্যদিকে জামায়াত বড় দল হলেও এককভাবে নির্বাচনে তারা ক্ষমতায় আসতে পারবেন কিনা-তা নিশ্চিত নয়। তবে ৮ দলীয় জোটের বিষয়টি ভিন্ন। অন্যদিকে এনসিপি সদ্য একটি দল, মাঠের রাজনীতি বুঝতে তাদের এখনও অনেক সময় লাগবে। যুব সমাজের একটি বৃহত্ত অংশ এনসিপিকে নিয়ে স্বপ্ন দেখছে, দেখার বিষয় জোট করবে, বিএনপি না জামায়াত।
এ মুহুর্তে সোশ্যাল মিডিয়া ও জনমনে কয়েকটি আলোচনার ঝড়: ১। এনসিপির প্রধান সারির যোদ্ধাদের দাবি জুলাই/২৪-এ সবথেকে বেশি সাহায্য পেয়েছে জামায়াতে ইসলামের ও ছাত্র শিবিরের, তবে কিছু কিছু এনসিপির নেতারা এ ব্যাপারে কোন কথা বলেননি। ২। বিএনপির উর্ধ্বতন নেতারা বলেছিলেন, শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত নিয়ে আমরা ভাবছিনা, তারা শুধু কোটা বিরোধী আন্দোলন চেয়েছিলো। তাছাড়া জামায়াতের কিছু নেতারা ৭১ এর ঘটনাকে অনেক ছোট করে দেখানোর চেষ্টা চলছে। তাহলে প্রশ্ন আওয়ামীলীগের ভোটগুলো কি বিএনপিই পেতে যাচ্ছে। অপরদিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জনমনে আলোচনায় এসেছে, ৫ আগষ্ট/২৪ এর পর বিএনপির সমর্থকেরা চাঁদাবিজ, আওয়ামী ট্যাগ দিয়ে বা মম সৃষ্টি করে হামলা মামলা, জমি দখল, স্ট্যান্ড দখলসহ যে ঘৃনিত কাজগুলো করেছেন তা কিন্তু জামায়াতের নেতা কর্মীরা করেনি। ৩। আই হ্যাভ দা প্ল্যান কি তা তারেক রহমানের স্পষ্ট করেননি, অনেকেই বলছেন প্ল্যান হলো জামায়াত জোটকে প্রলোভন দেখিয়ে বিএনপি তার নিজের ভোট ব্যাংকে যোগ করানো। ৪। তবে জনমনে আর একটি বড় শংসয় কাজ করছে প্রধান উপদেষ্টা নাকি বিএনপি সমর্থিত, সেদিক থেকে তিনি বিএনপি কে ক্ষমতায় নেওয়ার চেষ্টায় থাকবেন। ৫। উপদেষ্টাদের মধ্যে অধিকাংশ ছিলেন, বিএনপি সমর্থিত যেমন: উপদেষ্টা থেকে সদ্য বিদায়ী এনসিপি নেতা মাহফুজ, আসিফ মাহমুদ ও আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল সহ আরোও অনেকেরে নামে অভিযোগ তুলছে জনগন। ৬। এর পূর্বে বিএনপি কয়েকবার ক্ষমতায় গেলেও তারা বহু অনিয়ম ও দূর্ণীতি করেছে, বার বার কথা দিয়েও আশানুরুপ ফল দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে, এক কথায় তাদের অনিয়ম বেড়েছে বৈ কি কমেনি, তাদের কে কি জনগণ বিশ্বাস করবে? মানুষ কেউ সরকারের কাছে খাবার চায় না, চায় নিরাপদ জীবন যাপন, ছিনতাই হামলা মামলা থেকে রেহাই, নারীদের ইজ্জতের নিরাপত্তা। ৭। তারেক রহমান দীর্ঘদিন বিদেশে থাকলেও আন্তর্জাতিক কোন রাজনৈতিক নেতাদের সাথে তেমন কোন সম্পর্ক বা কথাপোকথন হয়েছে এমনটিও জানা যায়নি, যোদিও বা লোকমুখে জানা যায়, তারা ভারতের সাথে এক গোপন চুক্তি হয়েছে। ৮। জামায়াতের কয়েকজন নেতা শেখ মুজিব তথা ৭১ কে অনেক ছোট করে দেখানোর চেষ্টাও করেছেন। অনেকে বলছেন, বা জামায়াতের দাবি জামায়ত যদি ভারতের আধিপত্য বা দেশভাগ বিরোধীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলো তা যদি তাদের দিক থেকে সঠিক, তেমনি শেখ মুজিবও পাকিস্তানের শাসন থেকে এ বাংলাকে তথা বাংলাদেশকে রক্ষার চেষ্টায় স্বাধীন করেছে, তাহলে কেন তাকে ছোট করে দেখতে হবে। অন্যদিকে ৭১ পরবর্তীতে জামায়াত ইসলাম বা তাদের নেতা কর্মীদের দ্বারা কোন অপরাধের সাথে জড়িত হয়েছে তেমন কোন প্রমাণও পাওয়া যায় না। ৯। কয়েকদিন পরেই গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন কিন্তু ৪৮% এর বেশী লোক সিদ্ধান্ত নিতেই পারেনি, তারা কাকে ভোট দিবে। ১০। আই হ্যাভ দা প্ল্যান বাক্যটি কি শুধু ভোট ব্যাংকের জন্য, না প্রকৃতপক্ষে কোন পরিকল্পনা আছে, তা এখনও স্পষ্ট করেন নি। ১১। ভালো কোন প্ল্যানের কথা বলা আর বাস্তবে তা উপহার দেওয়া যদি এক হয়, তাহলে জনগণ সাদরে গ্রহণ করবে।
রাষ্ট্রচিন্তক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মতে, অতীতের ভুল ও ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে এবং অভিজ্ঞতার আলোকে যদি তারেক রহমান পথ চলে। তাহলে জনগণ ক্ষমতায় দেখতে চাইতে পারে।
শাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, যে প্ল্যানের কথা তারেক রহমান বলেছেন, সেটি ইতিবাচক ও জনগণের দাবি পূরন হলে তার প্র্যাকটিস এখনই শুরু করতে হবে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের মতে, অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে জনগণের প্রত্যশা বিশাল। তারা কর্তৃত্ববাদী আচরণ পরিহার চান। তারেক রহমান বলেছেন মহানবীর ন্যায়পরায়ণতার কথা। যে কোনো মূল্যে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার প্রত্যয়ের পাশাপাশি সব ধরনের উসকানির মুখে শান্ত থাকারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, হিন্দুসহ সবাই মিলে নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার কথা বলেছেন। তিনি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বলেছেন। তরুণ প্রজন্মকে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন। দেশ ও মানুষকে নিয়ে পরিকল্পনার বিষয়ে বলেছেন, ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’। বিশ্লেষকরা তার এ বক্তব্যকে রাষ্ট্রনায়কোচিত বলে মন্তব্য করেছেন। জনগণের নেতা হয়ে উঠে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নকেই তারা এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসাবে দেখছেন। এক্ষেত্রে তিনি কতটা সফল হবেন সুধী মহল থেকে সর্বত্র চলছে সেই আলোচনা।

এদিকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ফ্যাসিস্ট সরকার বিদায়ের পর বস্তুত বাংলাদেশের রাজনীতি এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়। সরকার প্রধান হিসাবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে শুরু হয় মতবিরোধ। সঙ্গে ছিল মব ভায়োলেন্স ও রাজনৈতিক সহিংসতা। এসব ঘটনা মানুষকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে দেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোগুলো ভেঙে পড়েছিল। পুলিশ ছিল সবচেয়ে ভঙ্গুর অবস্থায়। বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনও নানা সুবিধা আদায়ের দাবি নিয়ে মাঠে নামে। বিশৃঙ্খল এই পরিস্থিতি আলোচনা শুরু হয়, এখন তাহলে জনগণের ত্রাণকর্তা কে হবেন? কে এই পরিস্থিতি থেকে দেশকে রক্ষা করবেন? এমন পরিস্থিতির মধ্যে তারেক রহমান স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। পরিশীলিত ও ভারসাম্যমূলক বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আলোচনায় স্থান করে নেন তিনি। তার দেওয়া বক্তব্য আশার সঞ্চার করেছে তার নোত কর্মীদের। অন্যদিকে জামায়ত মাঠে ঘাঠে জনসাধরণের কাছে পৌছে গিয়ে মানুষের পালস বুঝে ফেলেছেন, তাদের মনে জায়গাও করে নিয়েছেন।

আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, তারেক রহমান এতদিন ভার্চুয়াল মাধ্যমে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে যেসব মেসেজ ও বক্তব্য জাতির উদ্দেশে দিয়েছেন তা আমরা রাজনৈতিক সচেতন সবাইই ওয়াকিবহাল ছিলাম। কথা হলো, দেশে ফেরার পর তিনি নতুন কোনো কথা বলেছেন বা মেসেজ দিয়েছেন কিনা? দেশে ফেরার পর আমি তার বক্তব্যে শক্তিশালী যে ইঙ্গিত পেলাম সেটা হলো দেশকে নিয়ে, দেশের জনগণের জন্য, উনার একটা প্ল্যান আছে। আমার মনে হয় এখন মানুষের প্রধান কৌতূহল বা প্রত্যাশা হলো মানুষ জানতে চায় সেই প্ল্যানটা কী? উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ধরা যাক একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসাবে আমার প্রত্যাশা হলো-ভিন্নমতের রাজনীতির গণতান্ত্রিক স্পেস তৈরিতে তিনি কী ভাবছেন সেটা জানা। একজন বেকার হয়তো চাইবেন দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর বেকারত্ব নিরসনে তার পরিকল্পনাটা কী? দেশের ব্যবসায়ীরা ভাববেন হয়রানি, চাঁদাবাজি থেকে তাদের মুক্তি দিতে তারেক রহমানের কার্যকর প্ল্যানটা কি ইত্যাদি ইত্যাদি।
বদিউল আলম মজুমদার : সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, জনগণ চায় অতীতের অন্যায়-অবিচার, দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন সবকিছুর অবসান হোক। মানুষ একটা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ চায়। শুধু ভোটের অধিকার নয়, মানুষের চাওয়া গণতান্ত্রিক উত্তরণ; যেন সামনের দিনে আর কোনো ফ্যাসিবাদের সৃষ্টি না হয়। অতীতেও মানুষ অনেকের কাছে প্রত্যাশা করেছিল। তাকে সেই লিডার হয়ে উঠতে হবে এবং সেই ধরনের নেতৃত্ব প্রদর্শন করতে হবে। সেটাই এখন তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তাকে নিজের ঘর থেকেই শুরু করতে হবে। এটা করতে না পারলে কিন্তু তিনি সফল হবেন না। কারণ আগের পলাতক সরকারও তার দিনবদলের সনদের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি করেছিল। কিন্তু তাদের কথা ও কাজে মিল ছিল না। তাছাড়া এখন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। চারদিক থেকে বহু রকম চাপ আছে। ফলে এটা কঠিন। তবে তারেক রহমান সুন্দর বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’। আমি মনে করি-এখন প্রধান কাজ হবে তার প্ল্যানটি প্র্যাকটিস করা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *