হাদিকে গুলির ঘটনায় সন্দেহভাজন কে এই ফয়সাল? ‘বারবার অনুরোধ করতাম হাদি সাবধানে থাকো, বের হইয়ো না’ জামায়াতের নুরুল ইসলাম সাদ্দাম

সেখ রাসেল, দপ্তর সম্পাদক: ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদিকে বর্তমানে কনজারভেটিভ ম্যানেজমেন্টে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে তার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ড। সেইসঙ্গে ১১ পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত নিয়েছে মেডিকেল বোর্ড। শনিবার (১৩ ডিসেম্বর) মেডিকেল বোর্ডের এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বিষয়টি জানানো হয়। হাদিকে গুলি করার ঘটনায় সন্দেহভাজন একজনকে শনাক্ত করেছে পুলিশ। বলা হচ্ছে, ওই ব্যক্তির নাম ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খান। তার পরিচয় নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে।

বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, করিম নামে এই ব্যক্তি কার্যক্রমনিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগের (এখন নিষিদ্ধ) রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ২০১৯ সালের ১১ মে ঘোষিত কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে তিনি সদস্য হয়েছিলেন। তার পুরো নাম ফয়সাল করিম দাউদ খান। হাদির প্রতিষ্ঠিত ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারসহ বিভিন্ন জায়গায় তার সঙ্গে ফয়সালের সাম্প্রতিক সময়ের কিছু ছবি রয়েছে। সেই ছবিগুলোতে থাকা ফয়সালের সঙ্গে আততায়ীর চেহারার সাদৃশ্য থাকায় গুলি ছোড়ার ঘটনায় তাকে সন্দেহ করা হচ্ছে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে।

শনিবার দুপুরে একই ব্যক্তির ছবি গণমাধ্যমে পাঠিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) বলেছে, হাদির ওপর গুলির ঘটনার সিসিটিভি ক্যামেরা ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ওই ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছে। তার ব্যাপারে তথ্য দিতে সবাইকে অনুরোধ জানিয়েছে ডিএমপি। এ ছাড়া ওসমান হাদিকে গুলি করা ব্যক্তিকে ধরিয়ে দিতে পারলে ৫০ লাখ টাকা পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।

ফয়সাল করিম সম্পর্কে যা জানা গেল: পেশাদারদের যোগাযোগমাধ্যম লিংকডইনে ফয়সালের নামে প্রোফাইল আছে। সেখানে তিনি নিজেকে অ্যাপল সফট আইটি, ওয়াইসিইউ টেকনোলজি ও এনলিস্ট ওয়ার্ক নামে তিনটি প্রতিষ্ঠানের মালিক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। লিংকডইনের তথ্য অনুযায়ী, ফয়সাল ২০১৩ সালে ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটারবিজ্ঞানে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। পরে আরেকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি এমবিএ করেছেন বলে সেখানে উল্লেখ রয়েছে। ২০২৪ সালে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনকারীদের দমনে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের সঙ্গে মাঠে ছিলেন বলে ছাত্রলীগের একটি সূত্র জানিয়েছে। সূত্রটি একটি প্রথম সারির গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছে, ওসমান হাদির ওপর গুলির ঘটনায় সন্দেহভাজন ফয়সাল করিম ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সদস্য (রেজওয়ানুল হক চৌধুরী ও গোলাম রাব্বানী নেতৃত্বাধীন কমিটি) ফয়সাল করিম দাউদ খান একই ব্যক্তি। হাদিকে গুলির ঘটনায় নাম আসার পর করিমের সঙ্গে আওয়ামী লীগ আমলে বাংলাদেশের দুইবারের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কিছু নেতার ছবি ফেসবুকে প্রকাশিত হয়েছে।

শরিফ ওসমান হাদিকে ‘গুপ্ত ও নিষিদ্ধ বাহিনী’ হামলা করেছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল নুরুল ইসলাম সাদ্দাম। তিনি বলেন, হাদি জুলাই বিপ্লবের অন্যতম সেনা নায়ক। যার আপসহীন নেতৃত্ব আজীবন আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কণ্ঠস্বর জারি রেখেছেন।

রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মাথায় গুলিবিদ্ধ ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদির শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা এই জুলাই যোদ্ধার চিকিৎসায় বিভিন্ন বিভাগের বিশেষজ্ঞ ১৫ জন চিকিৎসকের সমন্বয়ে একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে।

শনিবার (১৩ ডিসেম্বর) এক বিবৃতির মাধ্যমে এ তথ্য জানান এভারকেয়ার হাসপাতালের আইসিইউ অ্যান্ড এইচডিইউ বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ও কো-অর্ডিনেটর ডা. মো. জাফর ইকবাল।

বিবৃতিতে জানানো হয়, ওসমান হাদিকে শুক্রবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে অপারেশনের পরে এভারকেয়ার হাসপাতাল ঢাকার ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে স্থানান্তর করা হয় অপারেশন-পরবর্তী চিকিৎসার জন্য।

বিবৃতিতে ১১টি অবজারভেশন ও সিদ্ধান্ত তুলে ধরে মেডিকেল টিম। সেগুলো হলো— ১. ওসমান হাদির ব্রেন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যেহেতু অপারেশন সম্পন্ন হয়েছে সেহেতু এখন কনজার্ভেটিভভাবেই ম্যানেজ করতে হবে। ব্রেন প্রোটেকশন প্রোটোকল ফলো করে অন্যান্য সব সাপোর্ট চালিয়ে যেতে হবে। যদি একটু স্টেবল হয় তাহলে ব্রেনের রিপিট সিটি স্ক্যান করানো যেতে পারে। ২. ফুসফুসে ইনজুরি আছে ও চেস্ট ড্রেইন টিউবে যেহেতু অল্প ব্লাড আসছে সেহেতু সেটা কন্টিনিউ করতে হবে। ‘ফুসফুসে সংক্রমণ’ ও ‘এ আরডিএস’ যাতে ডেভেলপ না করে সেদিকে খেয়াল রেখে ভেন্টিলেটর সাপোর্ট চালিয়ে যেতে হবে।
৩. কিডনির কার্যক্ষমতা ফেরত এসেছে, সেটাকে ধরে রাখার জন্য ফ্লুইড ব্যালেন্স যেভাবে ঠিক রাখা হচ্ছে সেভাবেই কন্টিনিউ করতে হবে। ৪. শরীরে রক্ত জমাট বাঁধা ও রক্তক্ষরণ হওয়ার মধ্যে যে অসামঞ্জস্যতা দেখা দিয়েছিল (ডিআইসি) সেটা অনেকটাই ঠিক হয়ে এসেছে। এটাকে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করে রক্ত ও রক্তের বিভিন্ন উপাদান ট্রানফিউস করতে হবে।
৫. ব্রেন স্টেমে ইনজুরির কারণে ব্লাড প্রেসার ও হার্ট বিট ওঠানামা করছে। ব্লাড প্রেসারের জন্য সাপোর্ট যেভাবে দেওয়া আছে সেটা সেভাবেই চলবে। যদি হার্ট রেট কমে যায় তাহলে টেম্পোরারি পেস মেকার লাগানোর জন্য টিম সার্বক্ষণিক রেডি আছে, সেটা লাগানো হবে। ৬. ঢাকা মেডিকেল কলেজের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে, রেডিওলজি, আইসিইউ, এনেসথেসিয়া, সমস্ত ইউরো সার্জারিসহ ও অন্যান্য ডিসিপ্লিনের চিকিৎসকরা ও সাপোর্টিভ স্টাফরা যে হিরোইক কাজ করেছেন তার জন্য এই মেডিকেল বোর্ড সবাইকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাচ্ছে। ৭. বর্তমানে তার সার্বিক পরিস্থিতি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। ৮. মেডিকেল বোর্ড এ সামারিটি রোগীর ভাই ও তার আপনজনকে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তারা চাইলে মিডিয়ার মাধ্যমে তার আপডেট দেশবাসীকে জানাতে পারেন। মেডিকেল টিমের পক্ষ থেকে আমাদের সবার প্রিয় শরিফ ওসমান হাদির জন্য বিনীতভাবে দোয়ার অনুরোধ জানানো হচ্ছে। ৯. অযথা কেউ হাসপাতালে এসে ভিড় করবেন না। কোনো ভিজিটির এখানে এলাউড না। ১০. আমরা আপনাদের কাছে অনুরোধ করছি কোনো অনুমান বা ভুল তথ্য প্রচার না করে মেডিকেল বোর্ডের প্রতি আস্থা রাখুন। রোগীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মর্যাদা রক্ষায় সবাই সহযোগিতা করুন। ১১. আমাদের মেডিকেল টিম সর্বোচ্চ পেশাদারি ও আন্তরিকতার সঙ্গে তার চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছে। তার শারীরিক অবস্থার উন্নতির জন্য মেডিকেল বোর্ড ও তার পরিবারের পক্ষ থেকে সবাইকে দোয়া করার জন্য বিনীতভাবে অনুরোধ করা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *