সাতক্ষীরায় চিংড়ি কে পিছনে ফেলে এগিয়ে কাঁকড়া চাষ।

মিজানুর রহমান সাতক্ষীরা দেবহাটা প্রতিনিধি : সুন্দরবনের উপকূলীয় অঞ্চলে চিংড়ি কে পিছনে ফেলে এগিয়ে গেছে কাঁকড়া চাষ ‌। এই কাঁকড়া চাষে ‌বদলে গেছে হাজারো মানুষের জীবনের পরিবর্তন। এক সময় যারা দুমুঠো ভাত জোগাতে ‌কষ্ট পেতেন তারা এখন অনেকে হয়েছে আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ। উপকূলে কাঁকড়া চাষের মাধ্যমে নিজেদের উন্নয়নের চাকা ঘোরাতে ব্যস্ত চাষীরা। কাঁকড়া চাষের মাধ্যমে নিজ সহ অন্যদের বেকারত্ব ঘুচিয়েছে দক্ষিণাঞ্চলের চাষিরা। ৮০’র দশকের সময় থেকে এ অঞ্চলের মানুষেরা চিংড়ি চাষে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে চিংড়ি তার সঠিক আবহাওয়া সময় মতো না পাওয়ায় অনেকেই এই চিংড়ি চাষে ঝুঁকিতে পড়েছেন। এমতাবস্থায় উপকূলের চাষীরা সাদা সোনা খ্যাত চিংড়ি ফেলে কাঁকড়া চাষ নিয়েও নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন। এলাকার মানুষ ছাড়াও ভিনদেশী মানুষেরা নিজিদের ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন কাঁকড়া চাষের মাধ্যমে। এই ব্যবসাকে কেন্দ্র করে শিল্প নগরী গড়ে উঠেছে মুন্সিগঞ্জের কলবাড়ি থেকে নীলডুমুর রাস্তার দু’পাশে। বর্তমানে কালো সোনা খ্যাত সফট কাকঁকড়া নামে পরিচিত এই কাঁকড়া রপ্তানিযোগ্য পণ্য হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। ৯টি দেশে রপ্তানি হয় উপকুলীয় অঞ্চলের ১০ পা বিশিষ্ট চিংড়ি প্রজাতির এই কাঁকড়া। খুলনাসহ দেশের উপকুলীয় অঞ্চল থেকে প্রচুর কাঁকড়া আহরণ করা হয়ে থাকে। এ অঞ্চলের প্রায় হাজার হাজার বনজীবী নারী ও পুরুষ কাঁকড়া আহরণ বা বিপণনের সাথে জড়িত।
এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বুড়িগোয়লীনি-নীলডুমুর রাস্তার দু’পাশ ছেয়ে গেছে এই কাঁকড়া চাষে।
সংশ্লিষ্ঠ কাজে জড়িত একাধিক ব্যক্তির সাথে কথা বললে জানা যায়, সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর, আশাশুনি, কালিগঞ্জ, দেবহাটা ও তালা উপজেলায় কাঁকড়া চাষ করা হয়ে থাকে। জানা যায়, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, জাপান, ভিয়েতনাম, ইউকে, ইউএই, সৌদি-আরব, তাইওয়ান, হংকং নেদারল্যান্ড, জার্মান, ফ্রান্সা, অষ্ট্রিয়া, কুয়েত, কাতার, ওমান, বাহারাইন, উগন্ডা, হন্ডুরাস, ইউএসএ এবং ভারতে উপকূলীয় অঞ্চলের কাঁকড়া রপ্তানি করা হয়ে থাকে। শুধু তাই নয় বিগত দিনে কাঁকড়ার ক্রাভলেট অর্থাৎ বাচ্চা নদীসহ বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করতে হলেও তা এখন চলে এসেছে হাতের মুঠোয়। তবে এই ব্যবসায় চাষীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় কাঁকড়ার রেণু অর্থাৎ ক্রাভলেট সংকটে পড়তে পারে সুন্দরবন এমনটাই ভাবছেন এলাকার মানুষেরা।
কাঁকড়া চাষী মকবুল হোসেন বলেন, ‘সাধারণত আমাবশ্যা ও পূর্ণিমার গোনে কাঁকড়া ব্যবসা জমজমাট থাকে। শীত মৌসুমে মাদি কাঁকড়ার চাহিদা বেশি থাকে। তিনি আরও বলেন, ‘আশ্বিন মাসে কাঁকড়ার চাষ শুরু হয়। দুই মাস পর পর কাঁকড়া আমরা বিক্রি করি। স্থানীয় ডিপো গুলোতে কাঁকড়া কেনাবেচা হয়। অন্যদিকে মুন্সিগঞ্জ কাকড়া চাষি রঞ্জন মন্ডল বলেন, আমি ১০ কাঠা জমিতে চার ভাগে ভাগ করে সারাবছর কাঁকড়া চাষ করি, সংসারের ৫ সদস্য আর দুই ছেলেকে লেখাপড়ার খরচ চালাচ্ছি।
সফট কাঁকড়া চাষে এলাকার ৮ থেকে ১০ হাজার বেকার যুবক যুবতীদের কর্মসংস্থান হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘তবে এই ব্যবসাটি প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল, প্রকৃতি থেকে এভাবে নিয়মিত কাঁকড়ার রেণু ধরতে থাকলে একদিন প্রকৃতির উপর প্রভাব পড়বে। যদি কাঁকড়ার মজুদ নিরুপণ করা যেত তাহলে সে হিসাব মতে আহরণ নির্ধারণ করা যেত। তবে এই সফট কাঁকড়া চাষের পরিধি বাড়াতে চাইলে অবশ্যই সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে কাকঁড়া রেণুর হ্যাচারী তৈরি করতে হবে।’ মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, ‘হ্যাচারী করতে গেলে অবশ্যই মা কাঁকড়ার প্রয়োজন। তবে সুন্দরবন থেকে মা কাকঁড়া খুজে পাওয়া দুরহ ব্যাপার। তাছাড়া কাকঁড়া চাষে পানির লবণাক্ততা থাকা প্রয়োজন ৩০-৩৫ পিপিটি যা আমাদের এই অঞ্চলের পানিতে নেই। তবে এই এলাকা না হলেও দেশের যে অঞ্চলে পানির লবণাক্ততার পিপিটি বেশি সে অঞ্চলে উদ্যোগ নিলে হ্যাচারী সফল হবে বলে মনে করি।’
সুন্দরবনের গা ঘেঁষা সাতক্ষীরার শ্যামনগরে কাঁকড়া চাষ এখন আর কেবল বিকল্প আয়ের উৎস নয়। এটি এখন লাভজনক ও টেকসই শিল্প। ডিজিটাল পদ্ধতিতে পরিচালিত এ চাষাবাদে স্বাবলম্বী হচ্ছে শত শত পরিবার। কর্মসংস্থান হয়েছে নারীদেরও।
এখন সাতক্ষীরার প্রত্যন্ত গ্রামে গেলে দেয়া যায়, কাটা হচ্ছে হাজার হাজার তেলাপিয়া মাছ। যা খাঁচাবন্দি কাঁকড়াগুলোর খাবার। আর নিয়ম করে তিনবেলা লক্ষ্য রাখা কাঁকড়াগুলো খোলস পাল্টেছে কিনা। ২০ থেকে ২২ দিনের মধ্যেই কাঁকড়ার ওজন বাড়লে কাঁকড়াগুলো রপ্তানি হয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।
কাঁকড়ার এমন সম্ভাবনা দেখে সরকারি-বেসরকারি নানা সংস্থা যেমন আগ্রহী, তেমনি বর্তমানে চাষিরাও হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন এ খাতে।
শ্যামনগরের গাবুরা ইউনিয়নের ৯নং সোরা গ্রামের বাসিন্দা মতিউর রহমান। ৬ বিঘা জমিতে কাঁকড়া চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। তিনি বলেন, প্রায় পাঁচ-ছয় বছর ধরে খাঁচায় কাঁকড়া পালন করছি। ভালো লাভ হয়। তবে সমস্যা একটাই-পানির সংকট। আর যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো না। গাবুরা ইউনিয়নে একটি কোম্পানি কাজ করে। তারা নদীপথে বোট নিয়ে এসে নির্ধারিত স্থানে কাঁকড়া সংগ্রহ করে নিয়ে যায়।
সরকারি বা বেসরকারি সহায়তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা এখনো কোনো সরকারি সহযোগিতা পাইনি। যদি প্রশিক্ষণ ও পানির সমস্যা সমাধানে কেউ এগিয়ে আসে, তাহলে এই পদ্ধতিতে আরও বেশি মানুষ যুক্ত হবে।
সাতক্ষীরার এই প্রকল্পে শুধু চাষিরাই নন, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে বহু শ্রমজীবী মানুষের জন্যও। তাদের একজন মো. রবিউল ইসলাম। তিনি বলেন, সকাল ৭টা থেকে রাত ৭টা পর্যন্ত ডিউটি। এর মধ্যে কাঁকড়ার খাঁচা চেক করতে হয় দিনে চারবার- সকাল, দুপুর, বিকেল, সন্ধ্যায়। এরপর রাত ১১টা ও রাত ৩টায় দেখতে হয় খোলস বদলেছে কি না।
তিনি জানান, সফটশেল কাঁকড়া আলাদা করে তোলা হয়। পরে কোম্পানি সেই কাঁকড়া বিভিন্ন গ্রেডে কিনে নেয়। খাদ্য হিসেবে তেলাপিয়া মাছ দেওয়া হয় প্রতি তিন দিন পরপর।
জানা যায়, এই প্রকল্পে নারীরাও সরাসরি যুক্ত। কেউ কাঁকড়ার খাবার হিসেবে তেলাপিয়া মাছ কেটে দেন, কেউ খাঁচা পরিষ্কারের কাজ করেন।
স্থানীয় যুবক জাফর সাদিক সোহাগ বলেন, এই চাষের কারণে গ্রামের মানুষের কর্মসংস্থান বেড়েছে। নারীরাও আয় করছেন। এটা অনেক লাভজনক পদ্ধতি।
মৎস্য অফিস সূত্র জানায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সাতক্ষীরা জেলা থেকে ৬৪৪ মেট্রিক টন সফটশেল কাঁকড়া রপ্তানি হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা। বর্তমানে ৩৬৪ জন চাষি, জেলার ৩২১টি স্থানে এই চাষ করছেন। বছরে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মেট্রিক টন কাঁকড়া।
সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জি এম সেলিম বলেন, সাতক্ষীরায় চিংড়ির পাশাপাশি কাঁকড়া চাষ দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। এটি খুব সম্ভাবনাময় একটি খাত। আমরা প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালাচ্ছি, কিছু বেসরকারি সংস্থাও কাজ করছে।
তবে সমস্যার কথাও জানালেন তিনি। প্রতি বছর পাঁচ মাস সুন্দরবনে কাঁকড়া আহরণ বন্ধ থাকে এবং এখানে কাঁকড়ার হ্যাচারি নেই। হ্যাচারি হলে সারা বছর উৎপাদন সম্ভব হতো এবং কর্মসংস্থান অব্যাহত থাকত বলে মনে করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, আমরা চেষ্টা করছি সরকারিভাবে কীভাবে এই বন্ধ সময়েও চাষিদের সহায়তা দেওয়া যায়। বনবিভাগের সঙ্গে আলোচনাও চলছে। বাগদা বা গলদার পাশাপাশি কাঁকড়া চাষ আত্মকর্মসংস্থানের বড় মাধ্যম হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *