হাসিনাকে যে কারণে ফেরত দেবে না ভারত
সেখ রাসেল, সহকারী দপ্তর সম্পাদক: জুলাই/২০২৪ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বর্তমানে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। রায়ের পর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তাঁকে ফেরত দিতে ভারতের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। ভারত ফেরত দিবে কিনাি এ নিয়ে আল–জাজিরার অনলাইন সংস্করণে গতকাল মঙ্গলবার বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন করেছেন যশরাজ শর্মা।
ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণার পর হাসিনাকে ফেরত চেয়ে যে বিবৃতি বাংলাদেশ দিয়েছে এতে কঠোর ভাষায় বলা হয়েছে, যদি মানবতাবিরোধী হাসিনাকে ভারত এখনো আশ্রয় দেয় তাহলে এটি “অত্যন্ত অ-বন্ধুত্বপূর্ণ এবং ন্যায়বিচারের প্রতি অবজ্ঞার সামিল হবে।”
তবে তা সত্ত্বেও হাসিনাকে ভারত ফেরত দেবে না বলে সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে বলেছেন দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক প্রফেসর সঞ্জয় ভরদ্বাজ। তার মতে ভারত মনে করে, হাসিনা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। তাই তাকে ফাঁসিতে ঝোলার জন্য ভারত ফেরত দেবে না। ভারত হাসিনা প্রতিহিংসার শিকার মনে করলেও, জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে হাসিনার সরাসরি নির্দেশে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষকে হত্যা করেছে।
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের এ প্রফেসর আরও বলেছেন, “ভারতের দৃষ্টিতে বাংলাদেশ এখন ভারত বিরোধীদের দ্বারা চলছে। প্রফেসর ইউনূস প্রায়শই ভারতের সমালোচনা করেছেন। যারা হাসিনাকে হটিয়ে দিয়েছে, সেই বিক্ষোভকারীরা হাসিনাকে সমর্থন দেওয়ার জন্য ভারতকে দোষারোপ করে।” “এসবের মধ্যে যদি হাসিনাকে হস্তান্তর করা হয় তাহলে, যারা ভারত বিরোধীতা করছেন তাদের বৈধতা দেওয়া হবে।”— বলেন এ প্রফেসর। হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড ও আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরত চাওয়ার ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়েছে ভারত। দেশটি বলেছে, তারা হাসিনার দণ্ডের ব্যাপারে অবগত। এছাড়া বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত ভালো সম্পর্ক চায় বলেও এতে উল্লেখ করা হয়।
বাংলাদেশে দায়িত্ব পালন করা ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেছেন, “হাসিনাকে কীভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেবে নয়াদিল্লি?”
সাবেক এ রাষ্ট্রদূত বলেছেন, যতদিন হাসিনাকে বাংলাদেশ ফেরত না দেবে ততদিন দুই দেশের মধ্যে খারাপ সম্পর্ক বিদ্যমান থাকবে। তবে এমনটি সবসময় চলতে পারে না। তার মতে, ভারত এখন নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করছে। যখন নির্বাচিত কোনো সরকার আসবে তখন হয়ত সম্পর্ক ভালো হবে। তিনি বলেন, “ভারতকে এখন অপেক্ষা করতে হবে। বাণিজ্য ও অন্যান্য বিষয়কে সম্মন্নত রাখতে হবে। কিন্তু অন্য বিষয়গুলো নিয়ে ঝামেলা করা যাবে না।”
ভারতের জিন্দাল গ্লোবাল বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ প্রফেসর সিধার্ত দত্ত বলেছেন, “ভারত হাসিনাকে নিয়ে একটি ফাঁদে পড়ে গেছে। কিন্তু হাসিনা বিরোধী যে অবস্থা বাংলাদেশ চলছে এ বিষয়ে ভারত অন্ধ নয়।” তিনি বলেন, ভারত চাইবে আবার যেন আওয়ামী লীগ এবং মানবতাবিরোধী হাসিনা ক্ষমতায় আসুক। কারণ হাসিনা ভারতের জন্য সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি।
তবে ভারতকে এখন এই হিসাব পরিবর্তন করতে হবে এবং বাংলাদেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়তে হবে। সঙ্গে হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার যে বিষয়টি আসছে সেটি ভারতকে উতরাতে হবে।— বলেন সিধার্ত।
ঢাকা থেকে সীমা আখতার বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী হাসিনা ভেবেছিলেন, তাঁকে কখনো পরাজিত করা যাবে না। তিনি চিরদিন শাসনক্ষমতায় থাকতে পারবেন। তাঁর মৃত্যুদণ্ড আমাদের শহীদদের জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথে একটি পদক্ষেপ।’ সীমা মনে করেন, শুধু সাজা ঘোষণাই যথেষ্ট নয়। তিনি বলেন, ‘আমরা দেখতে চাই, তাঁকে এই ঢাকাতেই ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছে।’ কিন্তু কাজটা এত সহজ নয়।
সবচেয়ে বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শেখ হাসিনা। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেয়া শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ কন্যা। প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন ১৯৯৬ সালে। ২০০১ সালে পরাজিত হন। ক্ষমতার বাইরে ছিলেন ২০০৯ সাল পর্যন্ত। এরপর পুনরায় নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতা ধরে রাখেন টানা ১৫ বছর। এমন সব নির্বাচনে তিনি জয়ী হয়েছেন যেখানে প্রায়ই বিরোধী দলগুলো অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকতো বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে বিরত রাখা হয়েছে। তার আমলে জোরপূর্বক গুম হয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হন বহু মানুষ। নির্যাতনের ঘটনা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। বিনা দোষে কারাগারে গিয়েছেন বিরোধী দলগুলোর অগণিত নেতাকর্মী।
গত ১৫ মাস ধরে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বারবার ফেরত চাওয়ার পরও ভারতে হাসিনার অবস্থান দুই দেশের সম্পর্কে বড় ধরনের উত্তেজনার কারণ হয়ে আছে। এখন, মানবতাবিরোধী অপরাধে আনুষ্ঠানিকভাবে দণ্ডিত হয়ে মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার পর এই উত্তেজনা আরও বাড়তে চলেছে। যদিও ভারত একটি পোস্ট হাসিনা ঢাকার সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়তে আগ্রহী, তবুও বেশ কয়েকজন ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে নতুন দিল্লি এমন কোনো পরিস্থিতি কল্পনা করতে পারছে না, যেখানে তারা শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হতে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেবে।
বাংলাদেশে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যেসব মামলা রুজু হয়েছিল, তার মধ্যে হত্যা, গণহত্যা, গুম ও নির্যাতনেরও নানা অভিযোগ আছে। ফলে আপাতদৃষ্টিতে এগুলোকে ‘রাজনৈতিক’ বলে খারিজ করা কঠিন। তার ওপর ২০১৬ সালে যখন মূল চুক্তিটি সংশোধন করা হয়, তখন এমন একটি ধারা যুক্ত করা হয়েছিল, যা হস্তান্তরের প্রক্রিয়াকে বেশ সহজ করে তুলেছিল।
সংশোধিত চুক্তির ১০(৩) ধারায় বলা হয়েছিল, কোনো অভিযুক্তের হস্তান্তর চাওয়ার সময় অনুরোধকারী দেশকে সেই সব অভিযোগের পক্ষে কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ পেশ না-করলেও চলবে, শুধু সংশ্লিষ্ট আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা পেশ করলেই সেটিকে বৈধ অনুরোধ হিসেবে ধরা হবে।
কিন্তু এরপরেও চুক্তিতে এমন কিছু ধারা আছে, যেগুলো প্রয়োগ করে অনুরোধ-প্রাপক দেশ তা খারিজ করার অধিকার রাখে। যেমন, অনুরোধ-প্রাপক দেশেও যদি ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো ‘প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধে’র মামলা চলে, তাহলে সেটা দেখিয়ে অন্য দেশের অনুরোধ খারিজ করা যায়। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে অবশ্য এটা প্রযোজ্য নয়, কারণ ভারতে তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা হচ্ছে না বা অচিরে হওয়ারও সম্ভাবনা নেই। দ্বিতীয় ধারাটি হলো, যদি অনুরোধ-প্রাপক দেশের মনে হয় ‘অভিযোগগুলো শুধুমাত্র ন্যায় বিচারের স্বার্থে, সরল বিশ্বাসে আনা হয়নি’— তাহলেও তাদের সেটি নাকচ করার ক্ষমতা থাকবে।
অভিযোগগুলো যদি ‘সামরিক অপরাধে’র হয়, যা সাধারণ ফৌজদারি আইনের পরিধিতে পড়ে না, তাহলেও একইভাবে অনুরোধ নাকচ করা যাবে। ফলে ভারত এখনো অনায়াসেই বলতে পারে, শেখ হাসিনা বাংলাদেশে সঠিক ও সুষ্ঠু বিচার পেয়েছেন বলে তারা মনে করছে না এবং সে কারণেই তাকে হস্তান্তর করা সম্ভব নয়। অর্থাৎ ‘অভিযোগগুলো শুধুমাত্র ন্যায় বিচারের স্বার্থে, সরল বিশ্বাসে আনা হয়নি’—–এই ধারাটি ব্যবহার করেই প্রত্যর্পণের অনুরোধ নাকচ করা যাবে বলে দিল্লিতে অনেক পর্যবেক্ষকের অভিমত।

