একদিকে সঙ্কটে জুলাই সনদের স্বীকৃতি অন্যদিকে জনমনে প্রশ্ন পারবেকি সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে, ১৪, ১৮ ও ২৪ এর মত না হয়

সেখ রাসেল, সহকারী দপ্তর সম্পাাদক: বিশ্লেষকদের মতে, আড়ালের চোরাগোপ্তা আগ্রাসন, দেরিতে নেয়া সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ হিসাব-নিকাশ পুরো প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে।
জুলাই সনদের স্বীকৃতি প্রশ্নে আড়ালেই চলছিল রাজনৈতিক টানাপড়েন। এখন তা প্রকাশ্য সঙ্কটে রূপ নিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, আড়ালের চোরাগোপ্তা আগ্রাসন, দেরিতে নেয়া সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ হিসাব-নিকাশ পুরো প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে।
অন্তর্বর্তী সরকার বলছে, আওয়ামী লীগ নির্বাচন বানচাল করতে পারবে না। তবে মামলার রায়ের আগেই সারা দেশে ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে আগুনের ঘটনা বাড়ছে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার সাম্প্রতিক মন্তব্য ক্ষমতার টানাপড়েনকে আরো স্পষ্ট করছে।

আইনজ্ঞ, সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইকতেদার আহমেদ বলেছেন, রাজনীতিবিদরা ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকার তিনটি রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্ত মেনে নিলো। চাপিয়ে দেয়ার মতো একটা সিদ্ধান্ত। বিএনপি থেকে একটি, জামায়াত থেকে একটি ও এনসিপি থেকে একটি। রাজনৈতিক দলগুলো সরকারের এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে বলা যায় যে রাজনৈতিক সমঝোতা হয়েছে। সমঝোতা যদি না হয় তাহলে তো নির্বাচনের কোনো সম্ভাবনা দেখি না।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী আবু হেনা রাজ্জাকী বলেন, জুলাই আন্দোলনের পর সঠিক সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে তামাশা হয়েছে। সময় ক্ষেপণ করে মাসের পর মাস রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্য কমিশনের সাথে আলোচনা করেছে। প্রথমেই গণভোট করা যেত- আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রথমে খুনের বিচার, তারপর সংস্কার ও নির্বাচন চান কী না। আমার বিশ্বাস তাতে এত জটিলতা সৃষ্টি হতো না। ‘হ্যাঁ’ বিপুল ভোটে জিতত। এখন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জাতিকে আর যেন কিছু দেয়ার নেই। যে রাজনৈতিক দলটি মনে করছে নির্বাচন হলেই ক্ষমতায় যাবে তারা চান অন্তত নির্বাচন পর্যন্ত ইউনূস সাহেব থাকুক। আর যারা ফ্যাসিস্ট শক্তি হাসিনাকে ফিরিয়ে আনতে চাচ্ছে, যারা আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে বিচার বানচাল করার অপচেষ্টা করছে। তারা চান জটিলতা আরো বাড়ুক। জুলাই আন্দোলনে খুনিদের বিচার যারা চায় না তারা চায় ইউনূস সাহেব চলে গেলেই বাঁচি। তার মানে পরিস্থিতি এমন অবস্থায় দাঁড়িয়েছে নির্বাচনের পক্ষে বিপক্ষে শক্তিশালী দুটো পক্ষ কাজ করছে। আবু হেনা রাজ্জাকী মনে করেন ঠিক তাই। নির্বাচনে বিজয় সুনিশ্চিত যারা মনে করছেন তারা চান ইউনূস থাকুক। আর জুলাই আন্দোলনের আইনি ভিত্তি তো দূরের কথা, গণভোট বা নির্বাচন না হোক যারা চান তারা ক্রমান্বয়ে সক্রিয় হয়ে উঠছে, প্রকাশ্যে তোড়জোড় শুরু করেছে।
ইকতেদার আহমেদ মনে করেন, না এখন তো নির্বাচনের দিন গণভোট খুবই ডিফিকাল্ট টাস্ক। ভোটারের কাছে চার প্রশ্ন। চারটাতে হ্যাঁ বলতে হবে। একটাতে হ্যাঁ আরেকটাতে না বলার সুযোগ নাই। চারটাতে হ্যাঁ অথবা না বলতে হবে। একই দিন গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন, তারপর জুলাই বিপ্লবের স্বীকৃতি বা আইনি ভিত্তি। সংবিধানের অধীনে শপথ নেয়া এ সরকার এখন বলছে যে জনআকাক্সক্ষার বাস্তবায়নে জুলাই আদেশটা করেছে। এটাও তো সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে যাচ্ছে। জনআকাক্সক্ষার প্রতিফলনে প্রথমে সরকারটাই জনআকাক্সক্ষার করা উচিত ছিল। এখন যে জনআকাঙ্ক্ষা প্রতিফলনে জুলাই সনদ করল এটা তো সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। এ রকম অনেক ধরনের জটিলতা আছে। এখন আমেরিকাও তো প্রায় একই কথা বলছে। জাতিসঙ্ঘ বলছে। যেখানে যার খুনের বিচার হচ্ছে তাকে যদি নির্বাচনে নিয়ে আসেন? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হয়তো অন্য নামে আসবে। জাতীয় পার্টির নামে? তাদের যদি নির্বাচনের বাইরে রাখেন এটা তো একটা কেমন, তারা এত বছর দেশ শাসন করেছে। তাদের যদি ২০ শতাংশ ভোট থাকে।

কিন্তু রেস্ট অব দেম যারা একেবারে রাজপথে নেমেছে তারা যদি কোনো প্রাপ্তি না পায় তাদের রক্তের ওপর দিয়ে, তারা তো বারবার রাস্তায় নেমে আসবে না। আমরা তো রাজনৈতিক দলগুলোকে দেখেছি, তারা ১৬-১৭ বছর স্বৈরাচারের পতন ঘটাতে পারেনি, ছাত্র-জনতার আন্দোলন ও তাদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে এখন স্টেকহোল্ডার মনে করছে রাজনৈতিক দলগুলো। এত কিন্তু বা প্রশ্ন এখন বাংলাদেশে রাজনৈতিক জটিলতাই বাড়িয়ে দেবে অনেকের ধারণা।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, ‘এবারের নির্বাচন ১৪, ১৮ ও ২৪ এর মত হলে জাতির ভাগ্যে চরম দুর্ভোগ নেমে আসবে।’ প্রশাসনের কাছে আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, ‘আপনারা নিরপেক্ষ থাকুন। আগামী নির্বাচন স্বচ্ছ করুন। প্রত্যেক প্রার্থী যেন সমান সুযোগ পেয়ে নির্বাচনী কাজ করতে পারে।’ শনিবার (১৫ নভেম্বর) সকাল সোয়া ৯টায় মোটরসাইকেল শোভাযাত্রার উদ্বোধনকালে খুলনার জিরো পয়েন্টের পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘অতীতে যারা কোনো বিশেষ দলের পক্ষে কাজ করেছে, সেই ওসি-এসপিরা সব পালিয়ে গেছে। তারা এখন ট্রাইব্যুনালে হাজির। প্রধান বিচারপতি পালিয়ে গেছেন। বায়তুল মোকাররমের খতিব পালিয়ে গেছেন। ডিআইজি পালিয়ে গেছেন। পুলিশ কমিশনার পালিয়ে গেছেন। ওসিরা চাকরি ছেড়ে বর্ডার দিয়ে ইন্ডিয়া চলে গেছেন। আপনাদের বিরুদ্ধেও যদি সেই অভিযোগ আসে, আপনারা কিন্তু পালানোর পথ পাবেন না।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *