সংসদ নির্বাচন ও গণভোট এক দিনে হলে বাড়বে ভোট গ্রহণের সময় এবং হবে সংকটময় নির্বাচন, সামলাবে কিভাবে ইসি
সেখ রাসেল, সহকারী দপ্তর সম্পাদক: গণভোট ও সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বসহ (পিআর) নানা ইস্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত। এর মধ্যেই জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এক্ষেত্রে যদি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একদিনে হয় তাহলে ভোট গ্রহণের সময় আটঘণ্টার জায়গায় ১০ ঘণ্টা করা হতে পারে। ইসি ও সংস্কার কমিশনের নির্ভরযোগ্য সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
আনুষঙ্গিক সামগ্রী জোগাড়, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ ও গ্রামে-গঞ্জে প্রচার কাজ যেমন আছে, তেমনি ভোট গণনা করে ফলাফল ঘোষণার চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বর্তমানে নির্বাচনে সকাল ৮টা থেকে বিরতিহীন বিকাল ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে হলে, শুরুতে ও শেষে একঘণ্টা করে বাড়িয়ে ১০ ঘণ্টা করা হতে পারে। সেক্ষেত্রে ভোটগ্রহণের সময়কাল হবে সকাল ৭টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত।
এ নিয়ে সুশিল সমাজের ও জনমনে প্রশ্ন, দুটি ভোট একসঙ্গে হলে সরকার কি পারবে নিরপেক্ষ ভোটগ্রহণ ও ফলাফল ঘোষণা করতে। ইতিমধ্যে অনেক জাতীয় ইস্যুতে তাদের অপারগতা প্রকাশ পেয়েছে।
সরকার জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনে একই সঙ্গে গণভোট করার সিদ্ধান্ত দেওয়ার পর নির্বাচন কমিশনকে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে, এখন তাদের আগের পরিকল্পনায় গণভোটের প্রস্তুতিও সমন্বয় করতে হবে। প্রায় ৩৪ বছর পর আরেকটি গণভোট এবং দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এক দিনে একসঙ্গে দুটো ভোট করতে হবে। এছাড়া এবারই প্রথম পোস্টাল ব্যালটে প্রবাসীদের ভোটগ্রহণ হবে। দেশের প্রায় পৌনে ১৩ কোটি ভোটারের সঙ্গে প্রবাসের লাখ দশেক ভোটারকে নিয়ে এ নির্বাচন হবে। ফলে এই কর্মযজ্ঞ সামলাতে কী কী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে নির্বাচন কমিশনকে সেটি সামনে এসেছে
গণভোট ইস্যুতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির অবস্থান এখনও বিপরীত মেরুতে। জামায়াত চায় সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোট এবং বিএনপি একত্রে। গোপন সূত্রে জানা গেছে, গণভোট ও সংসদ নির্বাচন ভোট নিয়ে সচিবলায়, সুশিল সমাজে এক ঝড় বইছে। নির্বাচন কমিশনেও দুটি ভোট এক সঙ্গে সম্পন্ন করার নেই কোন অভিজ্ঞতা। জনাসাধারণে বলছে, দুটি ভোট একসঙ্গে হলে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে। খরচের দিক বিবেচনা করে এমন একটি সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশনকে। না কি বড় কোন রাজনৈতিক দলকে খুশি রাখতে করতে হচ্ছে দুটি ভোট একই সঙ্গে।
তবে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারের পদক্ষেপ চলতি সপ্তাহের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে যাবে। সেখানে সংবিধান-সংক্রান্ত ৪৮টি প্রস্তাব খসড়া আদেশের তফসিলে রাখা হয়েছে। একটি আদেশ জারি করে গণভোট করার সুপারিশ ছিল ঐকমত্য কমিশনের। সেখানে একটিই প্রশ্ন রাখার সুপারিশ ছিল। নির্বাচন কমিশন-ও গণভোটে একটি প্রশ্ন রেখে ‘হ্যাঁ বা না’ রাখার পক্ষে।
এদিকে, সাধারণ ভোট ও গণভোট একদিনে হবে ধরেই প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন ব্যবস্থাপনা শাখার একজন উপ-সচিব এ সংক্রান্ত প্রস্তাবনা তৈরি করছেন। সেখানে গণভোটের কারণে ভোটগ্রহণের সময় ৮ ঘণ্টা থেকে বাড়িয়ে ১০ ঘণ্টা করা হচ্ছে। প্রাথমিক খসড়া করে রাখা হচ্ছে, যাতে ইসির চাওয়া অনুযায়ী সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করলে নির্বাচন প্রস্তুতিতে কোনো সমস্যা না হয়।
চার বিষয়ে গণভোট, প্রশ্ন হবে একটি : জুলাই জাতীয় সনদে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব আছে। এর মধ্যে ৪৮টি সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো নিয়ে গণভোট হবে। প্রস্তাবগুলোকে চারটি বিষয়ে ভাগ করে একটি প্রশ্নে হবে গণভোট। প্রধান উপদেষ্টা জাতির উদ্দেশে ভাষণে বলেন, গণভোটের প্রশ্নটি হবে এ রকম: ‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?’
ক. নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে। খ. আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষবিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ জন সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে। গ. সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে। ঘ. জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।
জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘গণভোটের দিন এই চারটি বিষয়ের ওপর একটিমাত্র প্রশ্নে আপনি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে আপনার মতামত জানাবেন।’

