ঝালকাঠিতে ৬৮০ কোটি টাকার নদীরক্ষা প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতি

ঝালকাঠি প্রতিনিধি: ঝালকাঠিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নদীর তীররক্ষা কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ৬৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩ কিলোমিটারের বেশি এলাকাজুড়ে প্রকল্পটিতে ব্যবহার করা হচ্ছে নিম্নমানের বালু, ব্লক তৈরিতে বালুর অনুপাতে কম সিমেন্ট ও কম ওজনের জিও ব্যাগ। এসব অনিয়মের কারণে ইতোমধ্যে প্রকল্প থেকে একজন এসওকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এছাড়া বাতিল করা হয়েছে ব্লক তৈরির কাজে ব্যবহৃত বালু, জিও ব্যাগ ও ব্লক। ব্যাগে মানসম্মত বালু না থাকা, বাতিল করা বালু এখনো ফিল্ড থেকে না সরানো এবং প্রকল্পের আওতাভুক্ত ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় জিও ব্যাগ না ফেলাসহ নানা অনিয়মে পুরো কাজের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
একনেকের সভায় অনুমোদিত প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৮০ কোটি ১৩ লাখ টাকা। ‘সুগন্ধা নদীর ভাঙন হতে ঝালকাঠি জেলার সদর ও নলছিটি উপজেলার বিভিন্ন এলাকা রক্ষা’ নামের প্রকল্পটির আয়তন ১৩ দশমিক ২১৫ কিলোমিটার। চলতি বছরের জানুয়ারিতে শুরু হয়েছে, শেষ হবে ২০২৭ সালের জুনে। সদর উপজেলায় ১৮টি এবং নলছিটিতে ১৬টিসহ মোট ৩৪টি প্যাকেজে এই কাজ হওয়ার কথা থাকলেও শুরু হয়েছে মাত্র ১৭টির। বাকি প্যাকেজগুলোর এখনো কাজ শুরুই হয়নি।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, এখানে নদী প্রতিরক্ষা, প্রাক প্রতিরক্ষা ও মজবুতকরণ—এ তিনটি ভাগে নদী রক্ষার কাজ চলছে। সুগন্ধা নদীর তীরবর্তী সদর উপজেলার ভাটারিকান্দা, শহরের বাসস্ট্যান্ড ও কুতুবনগর এলাকা এবং নলছিটির তিমীরকাঠিতে ভাঙন রোধে ১৫টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এই কাজ বাস্তবায়ন করবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, ইতোমধ্যে ২১ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ১৫ শতাংশ বিল দেওয়া হয়েছে।

অনিয়মের প্রকৃত চিত্র জানতে গত ৯ নভেম্বর সকালে ঝালকাঠির কুতুব নগরে সরেজমিনে সেখানে দেখা যায় ইতিপূর্বে নিম্নমানের বালু দিয়ে ব্লক তৈরি করা হয়েছে। বিষয়টি এলাকাবাসীর নজরে আসলে পানি উন্নয়ন বোর্ড ওই বালু ব্যবহার নিষিদ্ধ করে দায়িত্বরত এসওকে প্রত্যাহার করে নেয়। এছাড়া ঠিকাদারকে সাইট থেকে নিম্নমানের বালু অপসারণের জন্য চিঠি দেয়।

এই প্রজেক্টের দায়িত্বরত ওয়ার্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট পংকজ কুমার সরকার বলেন, ১ দশমিক ৫০ এফএম (এটি একটি বালুকণা বা সমষ্টির নমুনার কণাগুলো কতটা সূক্ষ্ম বা মোটা, তা বোঝাতে ব্যবহৃত অভিজ্ঞতামূলক পরিমাপ) বালু দেওয়ার নিয়ম থাকলেও এখানে বালুর কোয়ালিটিতে তা ছিল না। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এমভিবি এবং এমটিআই (জয়েন্ট ভেঞ্চার) এখানে ১ দশমিক ৩৭ এওএম বালু দিয়ে ব্লক বানাচ্ছিল। যার কারণে টাস্কফোর্স এই বালু বাতিল করেছে। এরপর এক মাস কাজ বন্ধ ছিল। তবে ওয়ার্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট ১ দশমিক ৩৭ এফএম দেওয়ার কথা বললেও এলাকাবাসীর অভিযোগ শুধু এক এফএম বালু দিয়ে ব্লক বানানো হয়েছে।

একীভূত বা অবসায়নের পরামর্শ আইএমএফেরএকীভূত বা অবসায়নের পরামর্শ আইএমএফের কী পরিমাণ বালু বাতিল করা হয়েছে জানতে চাইলে এই প্যাকেজের এসও নাহিদ হাসান আমার দেশকে বলেন, ৪০০ কিউবেক (১৪ হাজার সিফটি) বালু বাতিল করা হয়েছে। তবে বাতিল করার আগে এই বালু দিয়ে কী পরিমাণ ব্লক বানানো হয়েছে তা তিনি জানাতে পারেননি।

কতুবনগর সাইটে দেখা যায়, এখনো বাতিল করা বালু স্তূপ করে রাখা হয়েছে। এই বালু দিয়ে যে আবারও কাজ হবে না তার নিশ্চয়তা কী জানতে চাইলে ঝালকাঠি পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নিলয় পাশা আমার দেশকে বলেন, ওখানে সার্বক্ষণিক পাহারা বসানো রয়েছে। তাই এই বালু দিয়ে কাজ করার কোনো সুযোগ নেই। তিনি আরো বলেন, ইতোমধ্যে এই প্যাকেজের দায়িত্বরত এসও তানভির শাহরিয়ারকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ঠিকাদার কেন বালু সরাচ্ছে না জানতে চাইলে নিলয় পাশা বলেন, বালু অপসারণের জন্য আমরা চিঠি দিয়েছি। এখন না সরালে আমাদের কী করার আছে? কুতুবনগরে ২৬ কোটি টাকা ব্যয় ৪৫০ মিটার নদী প্রতিরক্ষার কাজ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ১০ শতাংশ বিল তুলে নিয়েছে।

কতুবনগরের এই প্রকল্পের কাজ সম্পর্কে অভিযোগ করে এলাকার বাসিন্দা মাসুম খলিফা জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশে এখানে নিম্নমানের কাজ করে যাচ্ছিল। বালুর বিষয়টি ধরা পড়ায় এখন তা বাতিল করেছে। ব্লক তৈরিতে ছয়টি বালুতে একটি সিমেন্ট দেওয়ার নিয়ম থাকলেও ১২টি বালুতে একটি সিমেন্ট দেওয়া হচ্ছে। জিও ব্যাগে গাঁথনি বালু দেওয়ার নিয়ম থাকলেও দেওয়া হচ্ছে ভিটে বালু। এছাড়া মাত্র এক এফএম বালু দিয়ে ব্লক তৈরি করা হচ্ছে।

তবে এ অভিযোগ ভিত্তিহীন বলেছেন নির্বাহী প্রকৌশলী নিলয় পাশা। তিনি বলেন, জিও ব্যাগে গাঁথনি বালু দিতে হবে এমন কোনো নিয়ম নেই। ভিটে বালুতে শূন্য দশমিক ৮ এফএম থাকলেই হবে। ছয়টি বালুতেই একটি সিমেন্ট দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান। তবে এলাকাবাসীর অভিযোগ সুগন্ধা নদীর ভিটে বালুতে কখনোই শূন্য দশমিক ৮ এফএম হয় না। বাইরে থেকে আনলেও ভিটে বালুতে কোয়ালিটি ঠিক থাকে না।

সাইট থেকে বাতিল বালু না সরানো প্রসঙ্গে এই প্যাকেজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বরত প্রতিনিধি তরিক মৃধা বলেন, আমরা চিঠি পেয়েছি, কিন্তু বালু বিক্রির জন্য পার্টি পাচ্ছি না, তাই সরানো যাচ্ছে না। শুধু কুতুবনগরই নয়, এই প্রকল্পের সদর উপজেলার ভাটারাকান্দা প্যাকেজেও গিয়েও দেখা যায় অনিয়মের চিত্র। ১০ নভেম্বর সকাল সোয়া ৯টায় সাইটে গিয়ে দেখা যায়, শ্রমিকরা ব্লক ঢালাইয়ের কাজ করছেন। কিন্তু সেখানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোনো তদারককারি নেই। ফোন দেওয়া হলে ঘণ্টাখানেক পর আসেন এই প্যাকেজের এসও ওহিদুল ইসলাম। এখানে এক কিলোমিটার এলাকায় জিও ব্যাগ ও ব্লক ফেলা হচ্ছে।

তিনি বলেন, এখানে তিনটি প্যাকেজের কাজে ইতোমধ্যে ৫০ হাজার ব্লক ও বরাদ্দ এক লাখ ৮০ হাজার জিও ব্যাগের অধিকাংশই নদীতে ডাম্পিং করা হয়েছে। এখন পাঁচ থেকে ছয় হাজার জিও ব্যাগ বাকি রয়েছে। ইতোমধ্যে টাস্কফোর্স নিম্নমানের হওয়ায় ১০টি ব্লক বাতিল করেছে। তবে ভাঙনকবলিত চর ভাটারাবকান্দার বাসিন্দারা অভিযোগ করে বলেছেন, নদী যেখানে গভীর সেখানে জিও ব্যাগ ফেলা হয়নি। ভাটারাকান্দার জামাল হোসেন বলেন, যেখানে তীব্র ভাঙন সেখানে জিও ব্যাগ ফেলা হয়নি। এ বিষয় জানতে চাইলে সাইটে উপস্থিত এসও ওহিদুল ইসলাম বলেন, যে পাঁচ থেকে ছয় হাজার জিও ব্যাগ বাকি রয়েছে তা দিয়েই এই গ্যাপ পূরণ করা যাবে। ভাটারাকান্দা গ্রামের নদী তীরে যে জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে তার সঠিক ওজন নিয়েও এলাকাবাসীর মধ্যে সন্দেহ রয়েছে। এলাকাবাসী এ প্রতিনিধিকে বিষয়টি অবহিত করলে জিও ব্যাগের ওজন সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয় পানি উন্নয়ন বোর্ডে দায়িত্বপ্রাপ্ত এসওর কাছে।

তিনি বলেন, প্রতিটি জিও ব্যাগের ওজন হবে ২৭৫ কেজি। তবে অনেক বস্তায়ই ২৭৫ কেজি হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলে যেকোনো একটি বস্তার ওজন পরিমাপ করে দেখানোর অনুরোধ করা হয়। তখন এ প্রতিনিধিকে স্কেল এনে পরিমাপ করার কথা বলে আধা ঘণ্টা বসিয়ে রেখে এখানকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সুপার ভাইজার নজরুল ইসলাম এসে জানান, রুম তালাবদ্ধ থাকায় স্কেল এনে মাপ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া নদীর তীরে ফেটে যাওয়া একটি জিও ব্যাগের বালু দেখা যায় খুবই নিম্নমানের। এলাকাবাসীর অভিযোগ, এই বালু কখনোই শূন দশমিক ৮ এফএম হবে না। এখানে কারচুপি রয়েছে। তবে এ প্রসঙ্গে এসও ওহিদুল ইসলাম বলেন, এটা দেখার জন্য তো টাস্কফোর্সই আছে। ইতিপূর্বে টাস্কফোর্স ৪০০ বস্তা বালু ওজনে কম হওয়ায় তা বাতিল করেছে।

এই প্যাকেজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মতিন কনস্ট্রাকশনের প্রজেক্ট ম্যানেজার আবেদ আলী জিও ব্যাগ মাপার স্কেল সম্পর্কে বলেন, আমাদের একটি মেশিন। সেদিন হয়তো অন্য কোনো সাইটে ছিল, তাই আপনাদের জিও ব্যাগ ওজন করে দেখাতে পারেনি। প্রতিটি জিও ব্যাগে ২৫০ কেজি বালু থাকার নিয়ম বলে তিনি জানান। এলাকাবাসী জানান এই প্যাকেজের ভাঙনকবলিত যেসব জায়গায় এখনো জিও ব্যাগ ফেলা হয়নি সেখানে কম করে ১৫-২০ হাজার জিও ব্যাগ লাগবে। অন্যদিকে এ ব্যাপারে আবেদ আলী বলেন, আমাদের তিন থেকে চার হাজার ব্যাগ এখনো রিজার্ভ আছে তা দিয়ে বাকি জায়গায় জিও ব্যাগ ফেলা হবে।

এ প্রসঙ্গে ঝালকাঠি পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নিলয় পাশা বলেন, আমাদের লোকবল সংকট রয়েছে তাই সব সাইটে সময়মতো লোক যেতে পারছে না। চর ভাটারাকান্দায় একটি অংশে জিও ব্যাগ না ফেলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ওখানে বার্জ না ঢোকায় জিও ব্যাগ ফেলা যায়নি। তবে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে জিও ব্যাগ ফেলা হবে। ২৪ হাজার জিও ব্যাগ আমাদের কাছে রিজার্ভ আছে। ৩৪টি প্যাকেজের মধ্যে মাত্র ১৭টি প্যাকেজের কাজ শুরুর ব্যাপারে তিনি বলেন, যারা কাজ শুরু করেনি তাদের কাজ শুরু করার জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে। সুগন্ধা নদী তীর প্রতিরক্ষা প্রকল্পে অনিয়মের সার্বিক বিষয় দৃষ্টি আকর্ষণ করলে এই প্রকল্পের পিডি (প্রজেক্ট ডাইরেক্টর) পার্থ প্রতিম সাহা বলেন, বিষয়টি আমি আপনাদের কাছে জানলাম। নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে আলাপ করে ফয়সালা করতে পারব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *