এবার ওসিকে হুমকি দিলেন বাবলাসহ একাধিক খুনের আসামি বিএনপির রায়হান

স্টাফ রিপোটার: বিএনপির গণসংযোগে সরওয়ার হোসেন বাবলাসহ একাধিক খুনের আসামি সন্ত্রাসী রায়হান আলম তার ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে আবারও সরাসরি হত্যার হুমকি দিয়েছেন। এমনকি হুমকি দিয়েছেন রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকেও। পালাতক অবস্থায় থাকা রায়হানের এসব পোস্টে প্রতিপক্ষকে ‘ভয়ংকর মৃত্যু’, ‘খেলা শুরু’ এবং ‘টাকার কারিশমায় মামলা’- এমন ভাষায় সহিংসতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এসব পোস্ট ছড়িয়ে পড়ায় স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
গত কয়েক দিনে পরপর কয়েকটি পোস্টে রায়হান লিখেছেন, খারাপের শেষ দেখাই ছাইড়া দিমু তোমাদের। এক পোস্টে তিনি আজিজ নামে একজনের নাম ধরে লেখেন, আজিজের দালাল যারা আছে, তাদের নাম ঠিকানা ইনবক্সে দেন। বাকিটা আমি দেখে নিবো।’ তিনি দাবি করেন, কোনো তদন্ত ছাড়া টাকার বিনিময়ে তার নামে মামলা দেওয়া হয়েছে। তাঁর মন্তব্য, ‘আমি মাসিক বান্ডেল মারতে পারি নাই তাই আমার ফিছনে বাশ দিয়েছে। এগুলো কি টাকার কারিশমা না?’ এসব পোস্ট সবগুলোর ৫ নভেম্বর থেকে ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত ফেসবুকে লিখেন। তার ফেসবুক আইডির নাম রায়হান আলম। তার কাছের কয়েকজন এটি রায়হান আলমের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বলে নিশ্চিত করেছেন। রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলামও নিশ্চিত করেছন।
প্রতিপক্ষকে সরাসরি হত্যার হুমকি রায়হানের পোস্টগুলোর সবচেয়ে আলোচিত অংশে একজন ব্যক্তিকে উদ্দেশ করে তিনি লেখেন, ‘তোর মৃত্যু হবে সব চাইতে ভয়ংকর। কুকুরে তোর নারিভুরী ঠেনে ঠেনে খাবে।’ এই প্রকাশ্য সহিংস হুমকি স্থানীয়দের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। আরেকটি পোস্টে তিনি অভিযোগ করেন, তাকে হত্যা করতে ২০ লাখ টাকা বাজেট করা হয়েছে। পাল্টা তিনি লেখেন, আমি ৩০ লক্ষ দেবো আজিজকে জীবিত দিলে হবে।’
পুলিশ বলছে-এ ধরনের মন্তব্য স্পষ্টভাবে ‘উসকানিমূলক ও হুমকিমূলক’, যা নতুন সহিংসতার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তিনি লিখেন, ‘আমি হারাই নাই, দূর থেকে তামাশা দেখতেছি’। নিজেকে এখনো এলাকায় সক্রিয় দাবি করে রায়হান লিখেছেন, আমি হারিয়ে যাইনি তোমাদের তামাশা দেখতেছি দুর থেকে।’ তার আরেক মন্তব্যে এলাকার বিভিন্ন ব্যক্তিকে ‘মোনাফেক’ ও ‘দালাল’ আখ্যা দিয়ে তাদের নাম-ঠিকানা ইনবক্সে পাঠাতে বলেন। পরিচয় গোপন রাখার আশ্বাসও দেন। স্থানীয়দের অনেকে বলছেন, এটি কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিদের টার্গেট করার কৌশল হতে পারে।
মাদকবিরোধী সুরে শুরু, শেষে আরও হুমকি : এক পোস্টে রায়হান ৭নং ইউনিয়নের কিছু এলাকায় ‘ওপেন মাদক ব্যবসা’র অভিযোগ তুলে লেখেন, ‘মাদক বিক্রি বন্ধ না করলে যেই কোনোদিন আমার সাথে দেখা হয়ে যেতে পারে।’ স্থানীয়দের ধারণা, তাঁর এই বক্তব্য মাদকবিরোধী উদ্যোগের চেয়ে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিতই বেশি। সবশেষে রায়হান রাউজান থানার ওসি মনিরুল ইসলামকে উদ্দেশ করে লেখেন, ‘মামলা বাণিজ্য বন্ধ করুন। সঠিক তদন্ত না করে টাকার বিনিময়ে মামলা দিলে রাউজানের পরিস্থিতি আপনার কন্ট্রোলের বাইরে চলে যাবে।’
এক পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, একজন পালাতক খুনের আসামি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেভাবে হুমকি দিচ্ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিষয়টি আমরা গুরুত্ব সহকারে পর্যবেক্ষণ করছি। রাউজানের বিভিন্ন এলাকায় বাসিন্দারা প্রকাশ্যে কথা বলতে অনীহা প্রকাশ করেছেন। একজন স্থানীয় বলেন, ফেসবুকে যা লিখছে, তাতে মনে হচ্ছে বড় ধরনের কিছু ঘটাতে পারে। সবাই ভয় পায় তার নাম শুনলে। পুলিশ বলছে, রায়হানকে গ্রেপ্তারের জন্য বিশেষ নজরদারি চলছে। তার পোস্টগুলো থেকে নতুন তথ্য মিলছে, যা তদন্তে কাজে লাগানো হচ্ছে।
ওসি মনিরুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, আমাকেও সরাসরি হুমকি দিয়েছেন। এছাড়া অনেক লোককেও হত্যার হুমকি দিয়েছেন। আমরা তাকে ধরতে অভিযান অব্যাহত রেখেছি। জানতে চাইলে জেলার পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম সান্তু বলেন, হয় পুলিশ থাকবে না হয় সন্ত্রাসী। যারা সন্ত্রাসী কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আমরা কঠোর অবস্থানে আছি। অনেককে ধরতে অভিযান অব্যাহত রেখেছি। গত ৫ নভেম্বর বায়েজিদের আতুরার দিপুর চালিতাতলী এলাকায় বিএনপির প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর গণসংযোগে ঢুকে সরওয়ার হোসেন বাবলা খুনের প্রধান অভিযুক্ত দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী এই রায়হান। এছাড়া রাউজান উপজেলায় যুবদল কর্মী মো. আলমগীর ওরফে আলম, রাউজানের কদলপুর ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্যসচিব মো. সেলিম, রাউজান ইউনিয়নের যুবদল কর্মী মোহাম্মদ ইব্রাহিম, নগরীর বাকলিয়া এক্সেস রোডে প্রাইভেটকারে থাকা মো. বখতিয়ার হোসেন ওরফে মানিক (২৮) ও আব্দুল্লাহ আল রিফাত (২২) নামে দুজনকে গুলি করে হত্যা ও ঢাকাইয়া আকবরকে হত্যায় জড়িত রয়েছে তার নাম
কে এই রায়হান: রাউজানের ৭ নম্বর রাউজান ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের জুরুরকুল খলিফা বাড়ির মৃত বদিউল আলমের ছেলে মো. রায়হান। চট্টগ্রাম পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী। তার বিরুদ্ধে খুন, হত্যাচেষ্টা, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগে নগরী ও জেলার বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। পুলিশ জানায়, রায়হানের বিরুদ্ধে গত বছরের ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রাম নগর ও জেলায় জোড়া খুনসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১৪টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৭টি হত্যা মামলা। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ছোট সাজ্জাদের বাহিনীতে রয়েছে ২৫ জন সক্রিয় সদস্য। গত ১৫ মার্চ ঢাকার একটি শপিংমল থেকে সাজ্জাদকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর বাহিনীর হাল ধরে পাঁচ সহযোগী। তাদের অন্যতম সাজ্জাদের ডানহাত হিসেবে পরিচিত রায়হান। তিন ভাই এক বোনের মধ্যে রায়হান দ্বিতীয়। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলটির বিভিন্ন মিছিল ও সমাবেশে যোগ দিতো রায়হান। স্থানীয় এক ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যের সঙ্গে তার সখ্য ছিল। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর বিএনপির সভা-সমাবেশে যোগ দিতে শুরু করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *