জুলাই সনদ ও গণভোট আলোচনার টেবিল থেকে রাজপথে, দেশ হয়ে পড়ছে উত্তপ্ত

সেখ রাসেল, সহকারী দপ্তর সম্পাদক: সংস্কার প্রশ্নে গত প্রায় সাড়ে আট মাস রাজনৈতিক দলগুলো ছিল আলোচনার টেবিলে। সংসদ সচিবালয় ও ফরেন সার্ভিস একাডেমির আলোচনার টেবিল থেকে জুলাই জাতীয় সনদ ইস্যু এখন রাজপথে। ২ শতাধিক বৈঠক আর ১ কোটি ৭১ লাখ টাকা ব্যয়ের পরও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোকে একমতে, একপথে আনতে পারেনি জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। এ পরিস্থিতিতে জুলাই সনদ ইস্যু নিয়ে রাজপথে নেমেছে রাজনৈতিক দলগুলো। নভেম্বরে আবার রাজপথে কর্মসূচি নিয়ে নেমেছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ শীর্ষ রাজনৈতিক দলগুলো। একদিকে সংস্কার বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে ভিন্নমত, অন্যদিকে দ্রুত এগিয়ে আসছে নির্বাচনের সময়। এ পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলোর মাঠের কর্মসূচি নিয়ে নামার পেছনে নির্বাচনের প্রস্তুতি, নাকি রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত করার ইঙ্গিত—এ প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

সর্বশেষ গতকাল জুলাই সনদের অন্যতম স্টেকহোল্ডার বা অংশীদার জামায়াতে ইসলামী রাজধানীর পল্টন মোড়ে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সাংবিধানিক আদেশ জারি ও নভেম্বর মাসেই গণভোট আয়োজনসহ পাঁচ দফা দাবিতে সমাবেশ করে। সেখানে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে বলেন, জুলাই সনদে জনগণের দাবির প্রতিফলন ঘটেছে। তাই যতক্ষণ পর্যন্ত জনগণের দাবি পূরণ না করতে পারছি, ততক্ষণ আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, যারা জুলাই বিপ্লবের স্বীকৃতি দিতে নারাজ তাদের জন্য ২৬ এ কোনো নির্বাচন নাই। জুলাই সনদের আইনি ভিত্তির পাটাতন তৈরি হবে জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোটের মাধ্যমে। আর জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি ছাড়া কোনো নির্বাচন হবে না।

অন্যদিকে একই দিন জুলাই জাতীয় সনদে উল্লিখিত বিষয়ের বাইরে সরকার কোনো সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলে সনদে স্বাক্ষরকারী কোনো দলের জন্য তা মানার বাধ্যবাধকতা থাকবে না বলে জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। একই বিষয়ে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্যে কেউ কেউ জুলাই জাতীয় সনদের বাইরে কোনো কোনো বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের ঘোষণার প্রসঙ্গে যেসব বক্তব্য দিচ্ছেন, তা বিভ্রান্তিকর এবং ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করার শামিল। সে ক্ষেত্রে সব দায়-দায়িত্ব সরকারের ওপর বর্তাবে। এ ব্যাপারে সতর্ক পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বিএনপির পক্ষ থেকে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

মাঠে-ময়দানে, সেমিনারে চলছে কথার লড়াই, পাল্টাপাল্টি মন্তব্য। নতুন নতুন শব্দ যুক্ত হচ্ছে রাজনৈতিক অভিধানে। নিজেদের অনড় অবস্থানের পক্ষে এভাবেই সওয়াল করছেন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা।
পিআর বাস্তবায়ন কীভাবে হবে? গণভোটের দিনক্ষণই বা কবে? এসব প্রশ্নে আলোচনা ছেড়ে রাজপথে নেমেছে রাজনৈতিক দলগুলো। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ও জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজনের পক্ষে অবস্থান জামায়াতের, আর ঠিক উল্টো অবস্থানে বিএনপি। যেন এক বিন্দুতে পৌঁছানো পাহাড় ডিঙানোর মতোই কঠিন কাজ। রাজনৈতিক দলগুলোর রোজকার কথায় স্পষ্ট হচ্ছে অনৈক্যের সুর। এমন বাস্তবতায় শুরু হয়ে গেছে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ডামাডোল। তবে কি নির্বাচনী রেলে চেপে গন্তব্যে পৌঁছানোর সংকল্পে ঐক্যের সুর বাজবে না?

একদিকে নির্বাচনী প্রস্তুতি অন্যদিকে সংস্কার। রাজনৈতিক দলগুলোর বিপরীতমুখী অবস্থান ভোটের ময়দানকে করে তুলেছে অস্থির। সংকট সমাধানে ঐকমত্যে পৌঁছাতে বড় দলগুলোকে ছাড় দেয়ার মানসিকতা নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসার আহ্বান বিশ্লেষকদের।
এরই মধ্যে আলোচনার টেবিলে বসতে জামায়াতের আহ্বান নাকচ করেছে বিএনপি। তবে রাজপথের দখল নিতেও মরিয়া উভয় দল। যা উত্তপ্ত সময়েরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনগণের স্বার্থে বদলাতে হবে পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি। ক্ষমতার লোভ-লালসা আর দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে ঐক্যের সুরে সুর মেলাবেন রাজনীতিবিদরা। নানা পথ, নানা মত মিলবে একই মোহনায়-প্রত্যাশা দেশবাসীর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *