মনোনয়ন বিভ্রান্তিতে ক্ষতির আশঙ্কা ঝিনাইদহ -২ আসনে বিএনপিতে অস্থিরতা।
মোঃ সুরুজ ঝিনাইদহ প্রতিনিধি : ঝিনাইদহ-২ আসন বিএনপির দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। অথচ সেই শক্ত ঘাঁটি এখন অস্থিরতা আর বিভক্তির মুখে। দলের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতা, জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট এম. এ মজিদকে পাশ কাটিয়ে ঢাকার পরিচিত মুখ এবং যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দল গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খানকে প্রার্থী করার গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়তেই ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে তৃণমূল থেকে জেলা পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।
স্থানীয়দের দাবি, এটি একটি সুসংগঠিত জনআন্দোলনের ঘাঁটিতে “জনবিচ্ছিন্ন প্রার্থী চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা”।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৮১ সালে ছাত্রদলের রাজনীতি দিয়ে যাত্রা শুরু করেন অ্যাড. এম. এ. মজিদ। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজপথে সক্রিয় এই নেতার নামে রয়েছে ৫৩টি মামলা। আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তাঁকে একাধিকবার কারাভোগ করতে হয়েছে। এমনকি ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় তাঁর বাড়িতে হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়, তবু সংগঠন থেকে সরে যাননি।
২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে তারেক রহমানের প্রত্যক্ষ নির্দেশে প্রার্থী হয়েছিলেন মজিদ। তখনও হামলা-মামলা,b গ্রেপ্তার সবকিছুর মধ্যেও তিনি মাঠে ছিলেন। ফলে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের কাছে তিনি এখন ত্যাগ ও নেতৃত্বের প্রতীক।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি ইতোমধ্যে ২৩৭ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেছে। তবে ঝিনাইদহ-২ আসনের প্রার্থী নিয়ে অনিশ্চয়তা ও গুঞ্জন ঘিরে দলজুড়ে দেখা দিয়েছে বিভ্রান্তি।
সূত্রে জানা গেছে, গণঅধিকার পরিষদের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনের অংশ হিসেবে কয়েকটি আসনে যৌথ প্রার্থিতা নিয়ে আলোচনা চলছে। এরই ধারাবাহিকতায় ঝিনাইদহ-২ আসনে রাশেদ খানের নাম উঠে এসেছে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে। তবে স্থানীয় নেতাকর্মীরা এ প্রস্তাবকে ‘অযৌক্তিক ও আত্মঘাতী’ বলে মনে করছেন।
জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সাজেদুর রহমান পপপু বলেন, “ঝিনাইদহ সদর আসনে ভুল সিদ্ধান্ত হলে জেলা বিএনপির রাজনীতি ভেঙে পড়বে। আমরা ঐক্যবদ্ধ, মজিদ ভাইয়ের নেতৃত্বেই মাঠে আছি, থাকবো।”
হরিণাকুণ্ডু উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তাইজাল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “রাশেদ খানের এলাকায় কোনো কমিটি নেই, কোনো ভোটার সংযোগও নেই। মানুষ তাঁকে চেনে না। ভোট চাইতে গেলে মানুষ প্রশ্ন করবে আপনি কে?”
জেলা বিএনপির সহ-দফতর সম্পাদক সাকিব আহমেদ বাপ্পি বলেন, “গত ১৬ বছর হামলা-মামলা সহ্য করেছি, বাড়িঘর পুড়েছে। সেই সংগঠনের ত্যাগ উপেক্ষা করে যদি উড়ে আসা কেউ প্রার্থী হয়, আমরা তা মেনে নেব না।”
জেলা ছাত্রদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ইমরান হোসেন বলেন, “যে নেতা নিজের ২০ জন কর্মী জোগাড় করতে পারে না, সে কিভাবে ঝিনাইদহের প্রার্থী হবে?
সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও একই প্রতিক্রিয়া। হরিণাকুণ্ডুর এক চায়ের দোকানদার বলেন, “আমরা মজিদ ভাইয়ের জন্য কতবার মিছিল করেছি। এখন হুট করে কেউ এসে প্রার্থী হবে? ভোট যদি দিই, ত্যাগী নেতাকেই দেব।”
আরেকজন কৃষক বলেন, “রাশেদ খান ঢাকায় পরিচিত হতে পারেন, কিন্তু ঝিনাইদহের মানুষ তাঁর নামই জানে না। মজিদ ভাই ছাড়া অন্য কাউকে প্রার্থী করলে আমরা ভোট বর্জন করব।”
স্থানীয় নেতাকর্মীদের মুখে এখন একটাই স্লোগান,“আমাদের নেতা মজিদ ভাই, অন্য কেউ নয়!”
জেলা বিএনপির এক জ্যেষ্ঠ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “একদিকে মজিদের জনপ্রিয়তা, অন্যদিকে ঢাকার নেতাদের মনোনয়ন গুঞ্জন এটা দলীয় বিভক্তি ডেকে আনতে পারে। চাপিয়ে দেওয়া প্রার্থী এলে অনেকে হয় ভোটবিমুখ হবে, নয়তো প্রকাশ্যে বিদ্রোহ করবে।”
ঝিনাইদহ-২ আসন ‘হোল্ড’ করে রাখার বিষয়ে গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান জানান, “বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনের অংশ হিসেবে কিছু আসনে আলোচনা চলছে। ঝিনাইদহ-২ আসনও তার একটি। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।”
অন্যদিকে জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট এম. এ. মজিদ বলেন, “ঝিনাইদহ-২ আসন দলীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। প্রার্থী চূড়ান্ত হলেও কৌশলগত কারণে ঘোষণা দেওয়া হয়নি। তবে বাইরের কাউকে প্রার্থী করা হলে তা বিএনপির জন্য ক্ষতিকর হবে।”
তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের আশঙ্কা, ঝিনাইদহ-২ আসনে মনোনয়ন বিভ্রান্তি না মেটালে বিএনপি নির্বাচনে বড় ক্ষতির মুখে পড়বে। তারা মনে করেন, এখনই হাইকমান্ডের স্পষ্ট ও কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। এই সিদ্ধান্ত শুধু প্রার্থীর নাম নয়, বরং দলের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনাও নির্ধারণ করবে। তাদের প্রশ্ন একটাই দল কি ত্যাগ ও আন্দোলনের প্রতীক মজিদকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান দেবে, নাকি ছাড়ের রাজনীতিতে নিজেই নিজের শক্ত ঘাঁটি ভেঙে ফেলবে?”

