বাগাতিপাড়ায় কাফনের কাপড়ে আয়াত লিখে চিকিৎসা! রাশেদুলের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ
আব্দুল মজিদ, স্টাফ রিপোর্টার: নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার জামনগর ইউনিয়নের গয়লারঘোপ গ্রাম। সাদাসিধে গ্রামীণ পরিবেশ, যেখানে কৃষি আর দিনমজুরির ঘানি টেনে চলে মানুষের জীবন। এই এলাকার মানুষ চিকিৎসার জন্য শহরের হাসপাতালে সহজে যেতে পারেন না-অভাব, দূরত্ব ও অজ্ঞতার কারণে। এমন বাস্তবতায় ভরসার জায়গা হয়ে ওঠে এক তথাকথিত কবিরাজ-রাশেদুল ইসলাম। কিন্তু আধ্যাত্মিক চিকিৎসক হিসেবে পরিচিত এই ব্যক্তি আসলে একজন ভন্ড। তিনি কি আসলেই স্বপ্নের চিকিৎসক নাকি প্রতারণার কারিগর?
তিনি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পাননি। এমনকি কুরআন পড়তেও পারেন না। অথচ তিনি বলেন, আল্লাহপাক স্বপ্নে তাকে চিকিৎসা শিখিয়েছেন। সেই স্বপ্নের নির্দেশেই তিনি রোগীদের চিকিৎসা দেন। কাফনের কাপড়ে দেল কুরআনের আয়াত লিখে দেন ও দাবি করেন, জিন-ভূত তাড়ানো, বানমারা বা জাদু-টোনা কাটানো, পুরুষের শারীরিক সমস্যা সহ বিভিন্ন রোগ সারানো বিশেষ ক্ষমতা তার রয়েছে।
তার স্ত্রী রুপা খাতুন সাংবাদিকদের জানান, প্রায় ১০ বছর ধরে এই চিকিৎসা চালিয়ে আসছেন তার স্বামী। তার ভাষায়, “ আল্লাহ তাকে এ ক্ষমতা দিয়েছেন। জিনেরা যাদের কথায় ওঠানামা করে তাদেরকে দিয়ে রোগ ভালো করান তার স্বামী রাশিদুল।” একই কথা বলেন রাশেদুলের মা রিনা বেগমও। তিনি জানান, মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে স্বপ্নে তার ছেলে এই চিকিৎসা শিখেছে।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। রোগীর শারীরিক সমস্যাকে জাদু বা বানমারার ফল বলে ভয় দেখানো হয়। এরপর রোগমুক্তির নামে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়।
রাশেদুলের প্রতারণার ফাঁদে পড়ে নষ্ট হয়েছে বহু পরিবারের অর্থ-সম্পদ। শরিফুল ইসলামের বোন পান্না জানান, ভাইয়ের মানসিক রোগের চিকিৎসার জন্য কবিরাজ ২৫ হাজার টাকা চান। তারা দেন ২০ হাজার টাকা, কিন্তু কোনো উন্নতি হয়নি। টাকা ফেরতও পাননি।আয়ুব আলী অভিযোগ করেন, বাবার মাথার চিকিৎসায় ১২ হাজার টাকা দিলেও কোনো সুফল পাওয়া যায়নি। মর্জিনা, যিনি স্বামীকে নিয়ে স্ট্রোকের চিকিৎসা করাতে গিয়েছিলেন, তিনিও হতাশার সুরে বলেন, “টাকা নেওয়ার পরও কোনো পরিবর্তন হয়নি।”
সবচেয়ে ভয়ংকর ঘটনা ঘটেছে শরিফ নামের এক যুবকের সঙ্গে। তিনি মজা করে মৃত নানার চিকিৎসা চাইলে রাশেদুল বলেন, “বান-জাদু করা হয়েছে, দ্রুত চিকিৎসা না নিলে মৃত্যু ঘটবে।” অথচ ঐ রোগী তিন বছর আগে মারা গেছেন। এ ঘটনা পুরো গ্রামের মানুষকে নাড়িয়ে দিয়েছে। ভুক্তভোগীরা জানান, রাশেদুল একা নন। তার মা-বাবা চিকিৎসার নামে প্রতারণায় সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেন। রোগীর স্বজনদের বলা হয়, যদি চিকিৎসা না করা হয় তাহলে শিগগিরই মৃত্যু অবধারিত। আতঙ্কিত পরিবারগুলো বাধ্য হয়ে টাকা দেয়। ইউপি সদস্য শহিদুল ইসলাম বলেন, “অনেক দিন ধরেই রাশেদুলের কবিরাজি চলছে। কিন্তু সম্প্রতি প্রতারণার অভিযোগ বাড়ছে।” ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম রব্বানী খোলাখুলি জানান, “সে প্রতারণা করছে। প্রশাসনের উচিত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।” উপজেলা নির্বাহী অফিসার মারুফ আফজাল রাজন বলেন, “এটা গুরুতর অপরাধ। দ্রুত তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ সৈকত মো. রেজওয়ানুল হক জানান, “বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসাই মানুষের জন্য উপকারী। এসব অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি জনগণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। আমরা প্রশাসনের সহায়তায় এ ধরনের অপচিকিৎসা বন্ধে পদক্ষেপ নেব।”
উপজেলা ইমাম সমিতির সভাপতি মাওলানা একেএম আফজাল হোসেন বলেন, “কুরআন না জেনে কেউ কুরআনের আয়াত দিয়ে চিকিৎসা করতে পারে না। ‘দেল কুরআন’ নামে কোনো কুরআন নেই। এটি এক ধরনের ভন্ডামি, আমি এর তীব্র নিন্দা জানাই।” নাটোর জেলা পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলাম জানান, প্রতারিতদের অভিযোগের ভিত্তিতে রাশেদুলের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে এখনও চিকিৎসা ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়। দারিদ্র্য, অজ্ঞতা আর কুসংস্কারের কারণে অনেকেই হাসপাতালে না গিয়ে কবিরাজ বা ঝাড়ফুকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। রোগ সারানোর আশায় ভয় দেখানো ও ধর্মীয় আবহ সৃষ্টি করা প্রতারকদের প্রধান কৌশল। ফলে সাধারণ মানুষ সহজেই প্রতারণার ফাঁদে পা দেন।
ভুক্তভোগীদের ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। একইসাথে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি, প্রতারকদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, স্বাস্থ্যসেবার সহজলভ্যতা এবং সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হবে। ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করে এ ধরনের প্রতারণা আর যেন কেউ করতে না পারে, সেটাই সময়ের দাবি।

