বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন ৯০ দিন পর খুলছে ১ সেপ্টেম্বর তিন মাসের নিষেধাজ্ঞার পর জেগে উঠছে পর্যটন ও মৎস্যজীবী জীবন

এস.এম. সাইফুল ইসলাম কবির,বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি :দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল মৎস্যভান্ডার নামে খ্যাতবিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের উপকূলে দীর্ঘ ৯০ দিন বন্ধ থাকার পর আগামী সোমবার (১ সেপ্টেম্বর) থেকে উন্মুক্ত হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন। বিশ্রামের পর প্রাকৃতিক অপরূপ সাজে সেজেছে বৃহত্তম এ ম্যানগ্রোভ।

অভয়ারণ্যসহ সুন্দরবনজুড়ে নতুন উদ্যমে শুরু হবে জেলেদের মাছ ধরা ও পর্যটকদের আনাগোনা। পর্যটকদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুত পর্যটন ব্যবসায়ীরা। আর সুন্দরবনে প্রবেশের অপেক্ষায় ভ্রমণ পিপাসুরা। ইতোমধ্যেই ১১টি পর্যটনকেন্দ্র ও অভয়ারণ্য এলাকায় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে বন বিভাগ।

তিন মাসে নতুন রূপ পেয়েছে সুন্দরবন। তার সৌন্দর্য যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে দর্শণার্থীদের। করমজল, হারবাড়িয়া, দুবলা, কটকা, কচিখালী, নীলকমল, কালাবগী, শেখেরটেকসহ সমুদ্র তীরবর্তী ও বনাঞ্চলের সবকটি পর্যটন স্পট দর্শনার্থীদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। পর্যটন ব্যবসায়ীরা নতুনভাবে সাজিয়েছেন লঞ্চ ও অন্যান্য নৌযান। হরিণ, জলজ ও বণ্য প্রানীর অবাধ বিচরণ, গাছের ডালে ডালে পাখপাখালির কিচিরমিচিরসহ রোমাঞ্চকর ভ্রমনে উন্মুখ হয়ে আছেন পর্যটকরা। শুধু বন্য বা জলজ প্রাণী নয়, সুন্দরী, গেওয়া, গোলকাঠ সবকিছুতেই এক অন্যরকম সৌন্দর্য। ভাগ্য সহায় হলে মিলতে পারে রয়েল বেঙ্গলের দেখাও।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বন্যপ্রাণী ও মাছের প্রজনন মৌসুম হওয়ায় গত ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনের নদ-নদী, খাল ও বনে মাছ ধরা এবং পর্যটক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা ছিল। এই সময়ে সুন্দরবনের বিভিন্ন অঞ্চলে জেলে ও বনজীবীদের নৌযান চলাচলও বন্ধ ছিল। নিষেধাজ্ঞার কারণে হাজারো জেলে ও বনজীবী সংকটে পড়েন।

লম্বা বিরতির পর সুন্দরবনের বিভিন্ন খাল ও নদীতে মাছ-কাঁকড়া ধরতে যাওয়ার যাবতীয় প্রস্তুতি সেরে নিয়েছেন জেলেরা। নৌকা মেরামত, নতুন করে রং করার পাশাপাশি বাজার-সদাইও করে নিয়েছেন তারা। সহযোগী জেলেদের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্নের পাশাপাশি শিকার করা মাছ ও কাঁকড়া বিক্রির জন্য দর-দাম ঠিক করে নিয়েছেন মহাজনসহ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে। পর্যটকবাহী নৌযান মেরামতের পাশাপাশি নতুনভাবে সাজিয়ে প্রস্তুত করেছেন ট্রলার চালকরা।

তিন মাস বসে থাকায় অনেক ট্রলারের নিচ লবণাক্ততায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জানিয়ে পর্যটকবাহী ট্রলার মালিক দুলাল বলেন, পর্যটক পরিবহনের জন্য ধারদেনা করে ট্রলার প্রস্তুত করা গেছে। বছরের পুরো সময় পর্যটকদের জন্য সুন্দরবন উন্মুক্ত থাকলে ক্ষতি হবে না।

৯০ দিন পর সুন্দরবনের দুয়ার খোলার সময় হওয়ায় খুশি আশপাশ এলাকার মানুষ। তবে অল্প স্থানে একসঙ্গে হাজার হাজার বনজীবীর উপস্থিতিতে প্রত্যাশামতো মাছ ও কাঁকড়া শিকার করতে পারবেন কিনা, তা নিয়ে সংশয়ে আছেন জেলেরা। তা ছাড়া বড় কোম্পানিগুলোর আধিপাত্যের কারণে পছন্দের জায়গায় জাল ফেলা নিয়েও তারা উদ্বেগে রয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে বনকর্মীদের টহল জোরদারসহ অভয়ারণ্যের আয়তন হ্রাসের দাবি জানিয়েছেন তারা। উপকূলজুড়ে বিকল্প কর্মক্ষেত্র গড়ে তোলারও দাবি জেলেদের।

জেলেরা জানান, বন্ধের সময়ে সংসার চালাতে স্থানীয় বিভিন্ন সমিতি, এনজিওসহ মহাজনদের থেকে তারা ঋণ নিয়েছেন। আবার জাল ও নৌকা প্রস্তুতের জন্য শরণাপন্ন হয়েছেন দাদন ব্যবসায়ীসহ মহাজনদের। এ অবস্থায় সিন্ডিকেটকে বন বিভাগ সহায়তা করলে তাদের না খেয়ে মরার উপক্রম হবে। সুন্দরবনে ঢুকে পছন্দের জায়গায় মাছ ও কাঁকড়া শিকারে কর্তৃপক্ষের সহায়তা চান তারা।

বনকর্মীরা নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন না করলে সর্বস্বান্ত হবেন বলে দাবী জেলেদের। দাদন ব্যবসায়ী ও মহাজনদের ঋণের বোঝা নিয়ে এলাকাছাড়ার শঙ্কাও রয়েছেন জেলেরা।
নিষিদ্ধ মৌসুমেও অনেকে বিষ দিয়ে মাছ ধরেছে। এ অবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে মাছ পাওয়া নিয়ে সংশয়ে আছেন জেলেরা।

জেলেরা অভিযোগ করে বলেন, নিষেধাজ্ঞা থাকাকালে আমরা চরম অভাব-অনটনের মধ্যে দিন কাটাই। এ সময় আয়-রোজগারের কোনো সুযোগ না থাকায় আমাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে না খেয়ে থাকতে হয়। সরকার থেকে যে সহায়তা দেওয়া হয়, তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।

বংশপরম্পরায় সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল চল্লিশোর্ধ্ব জেলে হারুন শেখ বলেন, পরিবারের সদস্যদের খাওয়া-পরা থেকে শুরু করে চিকিৎসা ও শিক্ষা খরচ আসে সুন্দরবন থেকে। সাম্প্রতিক সময়ে বছরে একাধিকবার বনে প্রবেশ বন্ধের কারণে তাদের ঋণের বোঝা ভারী হচ্ছে। এ জন্য বিকল্প কর্মক্ষেত্র গড়ার পাশাপাশি সহজ শর্তে জেলে পরিবারের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি।

তারা আরও বলেন, নিষেধাজ্ঞা চলাকালে যদি বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে জেলে পরিবারগুলো দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র থেকে মুক্তি পাবে। তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা আমাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর। তাই এটি কমিয়ে দুই মাস করার পাশাপাশি পরিবারগুলোকে টিকিয়ে রাখতে বিশেষ ভর্তুকি বা কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা জরুরি।

মোংলার চিলা এলাকার জেলে বিদ্যুৎ মন্ডল ও আব্দুর রশিদ জানান, এই তিন মাস তারা প্রায় অর্ধাহারে দিন কাটিয়েছেন। পরিবার চালাতে এনজিও ও মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে হয়েছে। বর্তমানে তারা ট্রলার, জাল ও খাদ্যসামগ্রী প্রস্তুত করে সুন্দরবনে ফেরার অপেক্ষায় আছেন।

পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন ও পর্যটনকেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবির বলেন, পর্যটকদের স্বাগত জানাতে কটকা, কচিখালী, করমজল, হারবাড়িয়া ও আন্ধারমানিকসহ ১১টি পর্যটনকেন্দ্র সম্পূর্ণ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। লোকসমাগম না থাকায় হরিণ ও বানরসহ বন্যপ্রাণীর সংখ্যা বেড়েছে। এখন সকাল-বিকেল হরিণের দৌড়ঝাঁপ সহজেই দেখা যায়।

এ ছাড়া মাছ ধরা ও পর্যটন কার্যক্রমের জন্য অনুমতিপত্র (পাস) ইস্যু শুরু হবে। সংশ্লিষ্ট টহল ফাঁড়িগুলোকে প্রস্তুত থাকতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বাগেরহাট পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, পর্যটকদের বরণ ও জেলেদের মাছ ধরার জন্য বন বিভাগ সম্পূর্ণ প্রস্তুত। মৎস্যজীবী ও বনজীবীদের সহায়তার জন্য মন্ত্রণালয়ে তালিকা পাঠানো হয়েছিল, যা যাচাই করছে মৎস্য দপ্তর। আগামী বছর থেকে জেলেরা খাদ্য সহায়তা পাবেন।

তিনি আরও বলেন, বনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রতি বছরের মতো এবারও ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে পর্যটক ও বনজীবীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা ছিল। এ সময়ে মাছ আহরণ বন্ধ থাকায় নদী-খালে মাছের প্রজনন বেড়েছে। সুন্দরবনের মৎস্যসম্পদ রক্ষায় ২০১৯ সাল থেকে ইন্টিগ্রেটেড রিসোর্সেস ম্যানেজমেন্ট প্ল্যানিংয়ের সুপারিশ অনুযায়ী প্রতিবছর তিন মাস সুন্দরবন বন্ধ রাখা হয়।#

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *