সুন্দরবনে মধু আহরণ করতে গেলেন ৬ শতাধিক মৌয়ালী, মৌসুম শুরু হতে যাচ্ছে ৭ এপ্রিল

এস.এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সুন্দরবন থেকে ফিরে : আগামী ৭ এপ্রিল বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন পূর্ব -পশ্চিম সুন্দরবনে বন বিভাগের রেঞ্জের আওতাধীন সুন্দরবনে মধু আহরণের মৌসুম শুরু হতে যাচ্ছে।। শনিবার (৫এপ্রিল ) শেষ বিকেলে শরণখোলা ও চাঁদপাই থেকে তিন শতাধিক ও পশ্চিম বন বিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জের আওতাধীন সুন্দরবনেতিন শতাধিক মৌয়ালী মধু সংগ্রহের জন্য সুন্দরবনে যাত্রা করেছে। ৩ এপ্রিল থেকে মৌয়ালদের মধু সংগ্রহের পাশ ( অনুমতি পত্র) দেওয়া শুরু হয়। বনদস্যু আতংকে এবার মৌয়ালীর সংখ্যা কমে গেছে। বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, প্রতি বছর ১ এপ্রিল থেকে সুন্দরবনে মধু আহরণ মৌসুম শুরু হলেও এবছর ঈদুলফিতরের কারণে তা পিছিয়ে যায় কারণে মৌসুমের আনুষ্ঠানিকতা হবে ৭ এপ্রিল। । তবে এবার মৌয়ালদের সুন্দরবনে যাওয়ার আগ্রহ অনেকটা কম । সুন্দরবনে নতুন করে বনদস্যুদের অপতৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় মৌয়ালদের মাঝে অপহরণ আতংক দেখা দিয়েছে। দস্যুদের ভয়ে মৌয়ালদের আগাম দাদনের টাকা দিচ্ছেননা মধু ব্যবসায়ীরা। এ ছাড়া গত বছর সুন্দরবনে তেমন মধু পায়নি মৌয়ালরা এ কারণে এবছর সুন্দরবনে মৌয়ালের সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। মৌয়ালদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দস্যুদের ভয়ে অনেকেই এবার মধু আহরণে যাবেন না। দস্যুর হাতে অপহরণ হলেই ছাড়া পেতে দুই-তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ দিতে হয়। এ কারণে অসংখ্য মৌয়াল এবার নৌকায় পাস করেননি। মধু ব্যবসায়ী শরণখোলার মো. রাসেল আহমেদ, রিপন বয়াতী, মনিরুজ্জামান ও চাঁদপাই এলাকার মোঃ কামাল হোসেন বলেন, আগে বনে ঢুকলেই বনদস্যুদের চাঁদা দিতে হতো। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বনে যেতেন মৌয়ালরা। চাঁদা দিতে না পারলে অপহরণ ও নির্যাতন করা হতো। ২০১৮ সালে সুন্দরবন দস্যুমুক্ত ঘোষণার পর সুন্দরবনে নির্ভয়ে মধু আহরণ করে আসছেন মৌয়াল ও অন্যান্য বনজীবিরা। কিন্তু গত কয়েকমাস আগে হঠাৎ করে কয়েকটি দস্যু বাহিনীর আবির্ভাব ঘটেছে সুন্দরবনে। শরণখোলা রেঞ্জ অফিস সূত্রে জানা যায়, এবছর এ পর্যন্ত ২২ টি নৌকায় পাস নিয়েছে। যা গত বছরের অর্ধেকের কম। ২২টি নৌকায় শতাধিক মৌয়াল সুন্দরবনে গেছেন। চাঁদপাই রেঞ্জের ঢাংমারী ষ্টেশন কর্মকর্তা ফরেষ্টার সুরজিত চৌধুরী বলেন, তার ষ্টেশন থেকে ৩৫ টি নৌকায় পাশ নিয়ে ১৪০ জন মৌয়াল মধু সংগ্রহে সুন্দরবনে যাত্রা করেছেন। চাঁদপাই ষ্টেশন কর্মকর্তা ফরেষ্ট রেঞ্জার মিল্টন রায় বলেন, চাঁদপাই ষ্টেশন থেকে ৮টি নৌকায় পাশ নিয়ে ৫২ জন মৌয়াল সুন্দরবনে গেছেন। পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জ কর্মকর্তা (এসিএফ) রানা দেব বলেন, এবছর শরণখোলা রেঞ্জে মধু আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৫০ কুইন্টাল, মোম ১৬০ কুইন্টাল। বন বিভাগ সাতক্ষীরা রেঞ্জের তথ্য মতে, চলতি ২০২৫ মৌসুমে সরকারিভাবে মধু আহরণের লক্ষ্যমাত্রা দেড় হাজার কুইন্টাল ও মোমের লক্ষ্য মাত্রা ৪০০ কুইন্টাল নির্ধারণ করা হয়েছে। এক এপ্রিল বুড়িগোয়ালিনী ও কোবাদক স্টেশন থেকে ২০টি পাশ সংগ্রহ করেছে মৌয়ালরা। এর মধ্যে সকালে ৩০টি নৌকা সুন্দরবনে প্রবেশ করে।

মৌয়াল ফজলুল হক বলেন, ‘ঈদের পর আনন্দের সঙ্গে আশা নিয়ে সুন্দরবনে যাচ্ছি মধু আহরণের জন্য। কিন্তু মৌসুম শুরুর আগে অবৈধভাবে সুন্দরবন থেকে যে হারে মধু চুরি হয়েছে, জানি না আশানুরূপ মধু পাবো কিনা। অল্প জায়গায় মধু আহরণ করে আমাদের পরিবার পরিজনের ভরণপোষণ ও মহাজনের চালান ওঠানো কঠিন।’

আগামী দিনে সুন্দরবনের অভয়ারণ্যগুলোতেও মধু আহরণের অনুমতি দিতে সরকারের প্রতি আহবান জানান তিনি।

মৌয়াল ফজলুল হকের মতে, যে পরিমাণ মৌয়াল বনে যান তাদের জন্য মধু আহরণের এলাকা পর্যাপ্ত নয়। তাছাড়া অভয়ারণ্য থেকে মধু আহরণ না করার ফলে মধুগুলো নষ্ট হয়ে যায়।

সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী স্টেশনের স্টেশন কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান বলেন, ‘পবিত্র ঈদুল-ফিতরের কারণে এ বছর জাঁকজমকপূর্ণভাবে পহেলা এপ্রিলে মধু আহরণের উৎসব হয়নি। কিন্তু সীমিত পরিসরে মধু আহরণের জন্য পাশ দেওয়া হয়েছে বনজীবী মৌয়ালদের।’

তিনি আরও বলেন, ‘২২-২৩ অর্থ বছরে সুন্দরবন থেকে মৌয়ালদের মধু সংগ্রহ হয় ১০২৩ কুইন্টাল এবং মোম সংগ্রহ হয় ৩০৬.৯০ কুইন্টাল। ২৯০টি পাশের মাধ্যমে ২০৪৬ জন মৌয়াল সুন্দরবনে প্রবেশ করে মধু ও মোম সংগ্রহ করেন। পরবর্তী ২৩-২৪ অর্থ বছরে ৩৬৪টি পাশের মাধ্যমে ২৪৭০ জন মৌয়াল সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করতে যান। তাদের সংগৃহীত মধু ১২৩৫ কুইন্টাল এবং মোম ৩৭০ দশমিক ৫০ কুইন্টাল।

এবারও আশানরূপ মধু ও মোম সংগ্রহ হবে বলে জানান তিনি।
এ বছর সুন্দরবনে বনদস্যুদের অপতৎপরতার কারণে মৌয়ালের সংখ্যা কমে গেছে। সুন্দরবনে মৌয়ালদের নিরাপত্তায় বনরক্ষীরা কঠোর নজরদারী চালাবে। কোনো নৌকা দস্যুদের কবলে পড়লে মৌয়ালদের তাৎক্ষনিকভাবে বনরক্ষীদের জানানোর জন্য বলা হয়েছে বলে এসিএফ জানান।##

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *