তিন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে বিএনপি নেতার মামলা, সাক্ষী ছাত্রলীগ নেতা

রংপুর প্রতিনিধি:
রংপুরের পীরগাছায় তিন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সাইবার নিরাপত্তা আইনে মামলা করেছেন কল্যাণী ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ও ইউপি সদস্য নেছার আহম্মেদ। এ মামলায় সাক্ষী করা হয়েছে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ও কথিত সাংবাদিক রাজিব মুন্সিকে। গতকাল মঙ্গলবার রাতে বিষয়টি দৈনিক আমাদের সময়কে নিশ্চিত করেছেন পীরগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নুরে আলম সিদ্দিকী।

এর আগে গত রবিবার ঈদের আগের দিন বিএনপি নেতা ও কল্যাণী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নেছার আহম্মেদ মামলাটি করেন। অভিযোগ উঠেছে, নেছারকে দিয়ে মামলাটি করান পীরগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজমুল হক সুমন।
মামলায় আসামি করা হয়েছে একাত্তর টেলিভিশন ও দৈনিক সংবাদের পীরগাছা উপজেলা প্রতিনিধি আব্দুল কুদ্দুস সরকার, দৈনিক নতুন স্বপ্নের বার্তা সম্পাদক হারুন অর রশিদ বাবু এবং সাংবাদিক শাহীন মির্জা সুমনকে। এ ছাড়া ভিজিএফ বঞ্চিত আজগার আলী ও শাহজাহান মিয়াকে আসামি করা হয়েছে। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ঈদের পূর্বে কল্যাণী ইউনিয়নে সরকারিভাবে ভিজিএফের চাল বিতরণ করা হয়। কিন্তু কয়েকজন সাংবাদিক ও স্থানীয় লোকজন শিশু-কিশোরদের ব্যবহার করে একটি ভিডিও ধারণ করেন, যা ইউএনও, ইউনিয়ন পরিষদ প্রশাসক এবং ইউনিয়ন প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানোর উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। এ ঘটনায় সরকারের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া বাদী নেছার আহম্মেদ দাবি করেন, তিনি ইউএনও কার্যালয়ে আইনি সহায়তার জন্য যাওয়ার পথে অভিযুক্ত সাংবাদিকরা পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন এবং টাকা না দেওয়ায় তার ওপর আক্রমণ চালানো হয়। পরে ইউএনও নাজমুল হক সুমন ও ইউপি প্রশাসক ফারুকুজ্জামান ডাকুয়াকে বিষয়টি অবহিত করে মামলা দায়ের করা হয়।

অভিযোগে জানা যায়, কল্যাণী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের স্থলে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পান উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার ফারুকুজ্জামান ডাকুয়া। এরপর থেকেই তিনি স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। কেউ তার অনিয়মের প্রতিবাদ করলে তিনি ইউএনওকে দিয়ে ভয় দেখান বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঈদের আগে ভিজিএফের চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠে ইউপি প্রশাসকের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ইউএনওর নাম ব্যবহার করে ভিজিএফের স্লিপ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ভাগ করে দেন। এ ঘটনায় ২৬ মার্চ জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন ইউপি সদস্য ও সাংবাদিক শাহীন মির্জা সুমন। সাংবাদিক আব্দুল কুদ্দুস সরকার বলেন, ‘ইউএনও নাজমুল হক সুমন পীরগাছায় যোগদানের পর থেকেই একের পর এক অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতা করে যাচ্ছেন। আমরা এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করায় তিনি ক্ষিপ্ত ছিলেন। এমনকি তিনি নিজে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করেছেন। আমি তথ্য অধিকার আইনে একাধিক ভুয়া প্রকল্পের তথ্য চেয়েছি বলেই তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে আমাদের নামে মামলা করালেন।’

সাংবাদিক হারুন অর রশিদ বাবু বলেন, ‘আমি ইউএনও নাজমুল হক সুমনের বিরুদ্ধে একাধিকবার সংবাদ প্রকাশ করেছি। সর্বশেষ, কল্যাণী ইউনিয়নে ভিজিএফ বিতরণে অনিয়মের খবর প্রকাশ করি। এই ঘটনায় স্থানীয় ভুক্তভোগীরা ইউএনও ও ইউপি প্রশাসকের বিরুদ্ধে জুতা ও ঝাড়ু মিছিল বের করেন। আমি সেই মিছিলের লাইভ সম্প্রচার করি। এরপরই ইউএনও আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করালেন। আমরা তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই।’ শাহীন মির্জা সুমন বলেন, ইউএনও মামলার বাদী করেছেন কল্যাণী ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ও ইউপি সদস্য নেছার আহম্মেদকে। আর কথিত সাংবাদিক ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা রাজীব মুন্সিকে সাক্ষী করা হয়েছে।

পীরগাছা উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার ও ইউপি প্রশাসক ফারুকুজ্জামান ডাকুয়া বলেন,‘তদন্তাধীন মামলার বিষয়ে আমি কিছু বলতে চাই না। আপনি এ বিষয়ে বাদীর সঙ্গে যোগাযোগ করুন।’ এ বিষয়ে কথা বলতে পীরগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল হক সুমনের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। পীরগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি নুরে আলম সিদ্দিকী জানান, তিন সাংবাদিকসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে সাইবার নিরাপত্তা আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। তদন্ত চলমান রয়েছে। তিন সাংবাদিকদের নামে মামলার ঘটনায় ইউএনওর তদবিরের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি এ বিষয়ে বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *